,

নিজের শাস্তির দাবি জানিয়ে বিস্ফোরক বিবৃতি রোনালদোর

পর্তুগালের জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্তের নেপথ্যের ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দীর্ঘ এক বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, ক্ষোভ, ভুল বোঝাবুঝি এবং একাধিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরই তিনি দল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে নিজের কিছু ভুলের দায় স্বীকার করে সমর্থক ও সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন পর্তুগিজ এই তারকা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ১০ পৃষ্ঠার বিবৃতিতে রোনালদো জাতীয় দলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। সেখানে তিনি জানান, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর পর্তুগালের মানুষের উদ্দেশে বিদায়ী একটি বার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রেখেছিলেন। সেই বার্তা এখনও তাঁর কাছে রয়েছে। তবে জাতীয় দল ছাড়ার প্রকৃত সময় এলে তবেই সেটি প্রকাশ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাঁকে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, ফেডারেশন এখনও তাঁকে দলের অংশ হিসেবে চায়।

এরপর জাতীয় দলের নতুন কোচ নিয়েও রোনালদোর মতামত জানতে চাওয়া হয়। তিনি জানান, কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে বর্তমান কোচকেই তিনি সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছিলেন। তাই তাঁর নিয়োগের খবর পেয়ে খুশি হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে কোচের সঙ্গে প্রথম সরাসরি বৈঠকেও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেন রোনালদো।

সেই বৈঠকে কোচ তাঁকে জানান, জাতীয় দলের পরিকল্পনায় তাঁর ওপর আস্থা রয়েছে এবং তাঁর উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, কোচ একটি পরিকল্পনাও দিয়েছিলেন। সেখানে প্রথম ও শেষ ম্যাচে রোনালদোকে খেলানোর কথা ছিল। শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মাঝের ম্যাচগুলোতে তাঁর খেলার সময় ও দায়িত্ব নিয়ন্ত্রিত রাখার পরিকল্পনা ছিল।

তবে নরওয়ে ও ডেনমার্কের ম্যাচে দলের সঙ্গে ভ্রমণ না করার প্রস্তাব দেওয়া হলে রোনালদো তাতে আপত্তি জানান। পরিকল্পনা ছিল, একটি ম্যাচ খেলে তিনি পর্তুগালেই থেকে যাবেন এবং পরে দ্রাগাও স্টেডিয়ামের ম্যাচের আগে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন।

রোনালদো জানান, তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, বিদেশের ম্যাচে না গিয়ে দেশে থেকে যাওয়া দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর জন্য ভালো দৃষ্টান্ত তৈরি করত না। শেষ পর্যন্ত কোচ তাঁর যুক্তির সঙ্গে একমত হন। এ আলোচনায় আল নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমো কুতিনিও উপস্থিত ছিলেন বলেও রোনালদো জানান।

এরপর লিসবনে রোনালদোর বাসায় কোচের সঙ্গে আরও একটি বৈঠক হয়। তাঁর দাবি, সেই আলোচনা ছিল শান্ত এবং আগের সমঝোতার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরপর তিনি আলভালাদে স্টেডিয়ামের ম্যাচে অংশ নেন। বদলি হওয়ার পরও কোনো আপত্তি না জানিয়ে নিজ হাতে ব্রুনো ফার্নান্দেজের হাতে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড তুলে দেন।

রোনালদো বলেন, তখন তাঁর মনে হয়নি যে জাতীয় দলের হয়ে খেলোয়াড় ও অধিনায়ক হিসেবে সেটিই হয়তো তাঁর শেষ কয়েকটি মুহূর্তের একটি। তাঁর কাছে সেদিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পর্তুগালের জয়।

কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দিন পরিস্থিতি বদলে যায়।

রোনালদোর বক্তব্য অনুযায়ী, দুপুরের খাবারের সময় কোচের একজন সহকারী এসে তাঁকে জানান, কোচ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর কোচ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ৩০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত কি না। রোনালদো জানান, ওই ম্যাচে খেলার কথা তাঁর মূল পরিকল্পনায় ছিল না। তিনি শারীরিক পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছিলেন এবং পরবর্তী ম্যাচকে সামনে রেখে নিজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

তবুও কোচের অনুরোধে তিনি রাজি হন। তাঁকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয় এবং জানানো হয় যে ৩০ মিনিট খেলানো হবে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই রোনালদো ওয়ার্ম-আপ করতে থাকেন। কিন্তু সময় গড়ালেও তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি। রোনালদোর দাবি, কোচ তাঁর দেওয়া কথা রাখেননি।

ম্যাচ শেষে তিনি সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে যাননি। তবে এই সিদ্ধান্তের দায় তিনি নিজেই নিয়েছেন। পর্তুগালের সমর্থকদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে তাঁকে দেখতে আসা অন্য দর্শকদের কাছেও ক্ষমা চান তিনি। রোনালদোর ভাষায়, ম্যাচের পর তিনি শুধু একা থাকতে চেয়েছিলেন এবং ঘটনাটির কারণে হতাশ ছিলেন।

এর প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর কোচ ও সিমো কুতিনিওর উপস্থিতিতে রোনালদোর সঙ্গে একটি বৈঠক হয়। তাঁর দাবি, আলোচনাটি ছিল খোলামেলা এবং সেখানে আগের ঘটনার সমাধানের পথও ঠিক করা হয়েছিল।

রোনালদো জানান, কোচ ব্যক্তিগত আলোচনায় যা বলেছেন, সংবাদ সম্মেলনেও সেটিই প্রকাশ্যে বলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল—রোনালদো কখনো কয়েক মিনিটের জন্যও খেলতে অস্বীকৃতি জানাননি, জাতীয় দলের ক্যাম্পের পরিকল্পনা কোচ নিজেই করেছিলেন এবং তাঁকে মাঠে না নামিয়ে শুধু ওয়ার্ম-আপ করানো ভুল ছিল।

রোনালদোর দাবি, বৈঠক শেষে কোচ তাঁকে আলিঙ্গন করে আশ্বস্ত করেছিলেন যে বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে। তিনি ডেনমার্কের ম্যাচে খেলবেন না, তবে দ্রাগাও স্টেডিয়ামের ম্যাচে মাঠে নামবেন—এমন সমঝোতাও হয়েছিল বলে জানান তিনি।

পরে আলোচনার সারসংক্ষেপ তৈরি করতে কোচ, কুতিনিও ও তিয়াগো ক্রাভেইরোর মধ্যে একটি ভিডিও বৈঠক হয়। রোনালদোর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই আলোচনার ভিত্তিতে একটি সংক্ষিপ্ত নথি তৈরি করা হয়, যা তিনি নিজে অনুমোদনও করেছিলেন।

কিন্তু এরপরের বৈঠকেই পরিস্থিতি আবার বদলে যায় বলে দাবি করেন রোনালদো। তাঁর ভাষায়, ওই বৈঠকের আচরণ আগের ব্যক্তিগত আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কোচের কিছু কথা ও আচরণকে তিনি আগ্রাসী এবং অযৌক্তিক বলে মনে করেন।

রোনালদো তাঁর বিবৃতিতে কোচের দেওয়া আটটি পয়েন্টও তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়েছিল, জাতীয় দলের হয়ে ওই মৌসুমে রোনালদোর জন্য পরিকল্পনাটি কোচ নিজেই করেছিলেন। রোনালদোর জাতীয় দলের প্রতি দীর্ঘদিনের ভালোবাসা ও অবদান সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত পরিকল্পনা রোনালদো মেনে নিয়েছিলেন এবং কখনো কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।

নরওয়ের ম্যাচটিও রোনালদোর জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তবে কোচ মনে করেছিলেন, প্রথম ম্যাচের পর রোনালদো শারীরিকভাবে যথেষ্ট সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাই তাঁকে মাঠে নামানোর সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছিল এবং রোনালদো তাতে সম্মত হয়েছিলেন।

কোচ আরও স্বীকার করেছিলেন, পেলে বা দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো মর্যাদার একজন খেলোয়াড়কে মাঠে না নামিয়ে শুধু ওয়ার্ম-আপ করানো তাঁর ভুল হয়েছে। একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

কোচের নোটে আরও বলা হয়েছিল, তিনি রোনালদোকে জাতীয় দলে চান এবং তাঁর ওপর আস্থা রাখেন। সমর্থকদের অভিবাদন না জানানোর ঘটনাটিকেও সেখানে ব্যাখ্যা করা হয় হতাশার মুহূর্ত হিসেবে। জাতীয় দলের হয়ে ২৩০টির বেশি ম্যাচ খেলা রোনালদো পর্তুগালকে কতটা ভালোবাসেন, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ নেই বলেও ওই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে রোনালদোর দাবি, ওই নোটে একটি বিষয় ছিল না—কোচ তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, এমন কোনো উল্লেখ সেখানে পাওয়া যায়নি।

রোনালদোর কাছে এটিই ছিল দ্বিতীয়বার কথা না রাখার ঘটনা। আর নতুন কোনো প্রতিশ্রুতির অপেক্ষা না করে তিনি ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সত্য ও স্পষ্টতা তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ তাঁকে দলে না চাইলে সরাসরি সেটি জানালেই তিনি বিষয়টি মেনে নিতেন। তাঁর দাবি, সংবাদ সম্মেলনের দিন সকালে ফেডারেশনের সভাপতি ও কোচকে তিনি নিজেই বলেছিলেন, তাঁর উপস্থিতি না চাইলে যেন তাঁকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়। জবাবে দুজনই তাঁকে জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলেই তাঁর জায়গা রয়েছে।

রোনালদো আরও বলেন, প্রায় ২৫ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে কোনো কোচ বা জাতীয় দলের কর্মকর্তার কারিগরি কিংবা কৌশলগত সিদ্ধান্তে তিনি কখনো হস্তক্ষেপ করেননি। সিদ্ধান্ত ভালো বা খারাপ যা-ই হোক, তিনি তা মেনে নেওয়া এবং সম্মান করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হলে তিনি মনে করেন, সেই পরিবেশে তাঁর থাকা আর উপকারী নয়।

ক্যাম্প ছাড়ার জন্য সতীর্থদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন রোনালদো। একই সঙ্গে পর্তুগালের মানুষের কাছে আবারও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং তিনি মনে করেছিলেন, এরপর দলের সঙ্গে থাকলে সেটি দলের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।

নিজের সিদ্ধান্তের শাস্তি নিয়েও রোনালদো স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁর আচরণের পরিণতি কী হবে, সেটি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনকে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজন হলে তাঁকে শাস্তি দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, দলের অধিনায়ক হওয়ার কারণে তাঁর শাস্তি কম হওয়া উচিত নয়। ফুটবলে নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া প্রয়োজন।

জাতীয় দল থেকে তাঁর সম্ভাব্য বিদায় নিয়ে আলোচনার কথাও এসেছে বিবৃতিতে। রোনালদো জানান, ফেডারেশন তাঁকে যথাযথ একটি বিদায়ী ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দিতে চায়—এমন কথা তিনি শুনেছেন। তবে তাঁর কাছে জাতীয় দলের অর্থ বিদায় অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রতিযোগিতা এবং দেশের হয়ে জয়ের লড়াই।

নিজের বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও জাতীয় দলের সঙ্গে থাকার একটি ঘটনা স্মরণ করেন রোনালদো। তিনি জানান, সেই সময়ও পরের দিনের ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশের হয়ে খেলার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা বোঝাতে ঘটনাটি উল্লেখ করেন তিনি।

সবশেষে রোনালদো স্পষ্ট করে দেন, জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তিনি শারীরিকভাবে ফিট থাকলে, ক্লাবের হয়ে নিয়মিত খেলতে ও গোল করতে পারলে এবং কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকলে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও পর্তুগালের হয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুত থাকবেন।

তাঁর বক্তব্যের সারকথা—ব্যক্তিগত মর্যাদা বা তারকা খ্যাতির চেয়ে নিয়ম, সত্য এবং পারস্পরিক আস্থাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। আর সেই আস্থায় ফাটল ধরার পরই তিনি জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।