প্রচলিত বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কণ্ঠ, বিটবক্স ও শরীরের ছন্দে সংগীতের পূর্ণাঙ্গ আবহ তৈরি করে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে আলাদা পরিচিতি গড়েছে বিটমস্ফিয়ার। অ্যাকাপেলা ও বিটবক্সনির্ভর এই দল এবার দেশের সংগীতকে নিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ—ইউরোভিশন সং কনটেস্ট এশিয়ার জন্য গান’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ের পর আগামী ১৪ নভেম্বর ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় ইউরোভিশন সং কনটেস্ট এশিয়ার গ্র্যান্ড ফিনালেতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে দলটি।
বিটমস্ফিয়ারের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগীতচর্চা, সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টা এবং নতুন ধরনের পরিবেশনার প্রতি আগ্রহ। দলটির যাত্রার ভিত্তি তৈরি হয় ২০১৪ সালের শেষ দিকে, যখন সংগীতশিল্পী মোক্তাদির দেওয়ান শান্ত ও রোনেশ বিশ্বাস ‘বিটবক্স বাংলাদেশ’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। দুজনেই বিটবক্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তাঁদের দায়িত্বের ক্ষেত্র ছিল আলাদা। শান্ত মূলত সৃজনশীল ও সাংগঠনিক বিষয় দেখভাল করতেন, আর রোনেশ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বিটবক্সারদের খুঁজে বের করে তাঁদের একত্র করার কাজ করতেন।
বিটবক্সিং নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং শিল্পীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি সংগীতভিত্তিক কমিউনিটি গড়ে ওঠে। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন শিল্পী একে অপরের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান এবং বিটবক্সকে কেন্দ্র করে একটি সক্রিয় পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে একাধিক কণ্ঠকে একসঙ্গে ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ সংগীতের আবহ তৈরির পরিকল্পনা শান্তর মাথায় ছিল আরও আগে থেকেই। প্রায় ২০০৯ সাল থেকেই তিনি এমন একটি সংগীতদল গঠনের কথা ভাবছিলেন, যেখানে একাধিক শিল্পীর কণ্ঠ মিলিয়ে সুর, তাল ও ছন্দের বিভিন্ন স্তর তৈরি করা যাবে। প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রের বদলে মানুষের কণ্ঠই হবে সেই সংগীতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
২০১৫ সালে সেই ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয় বিটমস্ফিয়ারের মাধ্যমে। অ্যাকাপেলা ও বিটবক্সকে কেন্দ্র করে দলটি পথচলা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সদস্য পরিবর্তন হয়েছে, বদলেছে কাজের ধরনও। একপর্যায়ে দলটির কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। পরে মহামারির পর ২০২১ সালে শান্ত আবার বিটবক্স বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বেড়ে ওঠা শিল্পীদের নিয়ে বিটমস্ফিয়ারকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেন।
এরপর দলটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে আরও নিয়মিত ও সংগঠিত হয়ে ওঠে। ঢাকায় শান্তর প্রতিষ্ঠিত ব্যারিটোন স্টুডিওস হয়ে ওঠে সদস্যদের আড্ডা, অনুশীলন ও রেকর্ডিংয়ের জায়গা। সেখানে অ্যাকাপেলা সংগীত রেকর্ড করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সংগীত কনটেন্ট তৈরির কাজও চলত। দলগত পরিবেশনায় সমন্বয় বাড়াতে নিয়মিত অনুশীলন ছিল তাদের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে বিটমস্ফিয়ারের পূর্ণাঙ্গ সদস্যসংখ্যা নয়জন। তবে নিয়মিত পরিবেশনায় অংশ নেন ছয়জন। দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আহনাফ আনিন্দো, ইশতিয়াক জোবায়ের, খন্দকার শামস, মাহি বিন আশরাফুল, মাহি হোসাইন খান, প্রচ্য প্রিয়দীপ, রাফিউন নবী নাহিন, সিদরাতুল মুরসালিন ভাষা এবং শান্ত।
বিটমস্ফিয়ারের সংগীতের মূল বৈশিষ্ট্য হলো কণ্ঠকে বহুমাত্রিকভাবে ব্যবহার করা। সদস্যরা শুধু গান করেন না; তাঁদের কণ্ঠ দিয়েই তৈরি হয় ছন্দ, পারকাশন ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের অনুরূপ শব্দ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিটবক্স, শরীরের ছন্দ এবং বিভিন্ন ধরনের ভোকাল কৌশল। ফলে কয়েকজন শিল্পীর সম্মিলিত পরিবেশনাও অনেক সময় একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ডের মতো শোনায়।
এই ভিন্নধর্মী সংগীতচর্চার বড় স্বীকৃতি এসেছে ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ—ইউরোভিশন সং কনটেস্ট এশিয়ার জন্য গান’ প্রতিযোগিতায়। ‘তুমি এলে’ গানটি পরিবেশন করে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে জয়ী হয় বিটমস্ফিয়ার। এর মধ্য দিয়ে তারা ইউরোভিশন সং কনটেস্ট এশিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। দেশীয় দর্শক, বিচারক এবং আন্তর্জাতিক দর্শকের ভোটের সমন্বয়ে বিজয়ী নির্বাচন করা হয়।
এই জয় দলটির জন্য নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে অ্যাকাপেলা ও বিটবক্স তুলনামূলকভাবে ভিন্নধারার চর্চা হলেও বিটমস্ফিয়ার সেই ধারাকে সামনে নিয়ে এসেছে সংগঠিত দলীয় পরিবেশনার মাধ্যমে। তাদের সাফল্য দেখিয়েছে, প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রের বাইরে গিয়েও কণ্ঠনির্ভর সংগীতকে প্রতিযোগিতামূলক বড় মঞ্চে উপস্থাপন করা সম্ভব।
এখন অপেক্ষা আন্তর্জাতিক মঞ্চের। আগামী ১৪ নভেম্বর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হবে ইউরোভিশন সং কনটেস্ট এশিয়ার গ্র্যান্ড ফিনালে। সেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বাংলাদেশের এই অ্যাকাপেলা দল।
‘তুমি এলে’ গানটি দিয়েই আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে নিজেদের পরিবেশনা তুলে ধরবে বিটমস্ফিয়ার। তাদের লক্ষ্য শুধু প্রতিযোগিতায় ভালো করা নয়; কণ্ঠ, ছন্দ ও বিটবক্সের সমন্বয়ে বাংলাদেশের সংগীতের একটি ভিন্নধর্মী সম্ভাবনাকেও তুলে ধরা। দীর্ঘ পথচলার পর ব্যাংককের মঞ্চে সেই পরিচয় কতটা বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









