,

কাতার থেকে গ্যাস আসা অনিশ্চিত, কী হবে জ্বালানি সরবরাহে

কাতার থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নতুন করে চাপে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের গ্যাসের চাহিদা এমনিতেই সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজির কোনো অংশ নিয়মিতভাবে না এলে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।

এরই মধ্যে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় কয়েকশ টাকা বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।

কাতারের সরবরাহে কেন অনিশ্চয়তা

২৮ সেপ্টেম্বর কাতারএনার্জি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ এশিয়ার কয়েকটি ক্রেতার জন্য এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ইতালির এডিসনের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত গড়িয়েছে।

এর অর্থ কাতার বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে—এমন নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও ওই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে কিছু এলএনজি চালান গেছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির জায়গাটি হলো নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। কোনো একটি চালান বিলম্বিত হওয়া বা সরবরাহের পরিমাণ কমে গেলেও এমনিতেই ঘাটতিতে থাকা জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

চাহিদার তুলনায় বড় ঘাটতি

বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট। সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৬ থেকে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে আনুমানিক ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট।

বর্তমান সরবরাহের মধ্যে দেশীয় গ্যাস থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি থেকে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ১ বিলিয়ন ঘনফুট।

এই ব্যবধানের পেছনে দীর্ঘদিনের উৎপাদনসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে। নতুন কূপ খনন ও অনুসন্ধানের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে বর্তমান ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু এই নির্ভরতার সঙ্গে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

মহেশখালীর টার্মিনাল কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে মহেশখালীর দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট বা এফএসআরইউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এফএসআরইউকে সাধারণ গ্যাসের গুদাম হিসেবে দেখলে বিষয়টি বোঝা কঠিন হবে। জাহাজে করে তরল অবস্থায় এলএনজি আনার পর এসব টার্মিনালে তা পুনঃগ্যাসীকরণ করা হয়। এরপর গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়।

তাই আমদানির পরও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে টার্মিনাল, আবহাওয়া এবং সমুদ্রপথ—সবকিছুর ওপর নির্ভর করতে হয়। জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউতে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়েছিল। মেরামতের পর সরবরাহ বাড়ানো হয়। সেপ্টেম্বরে খারাপ আবহাওয়ার কারণেও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল।

এসব ঘটনা বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা সামনে আনে। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে গ্যাস কেনা গেলেও সেটি দেশে পৌঁছানো এবং জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে একাধিক অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর।

পাইপলাইনে চাপ কমলে বাড়ছে এলপিজির চাপ

গ্যাসের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। পাইপলাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকলে অনেক পরিবার রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকছে। এতে বিকল্প জ্বালানিটির চাহিদা বাড়ছে।

সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ২ হাজার টাকা বা তার বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তবে দেশে সামগ্রিকভাবে এলপিজির ঘাটতি রয়েছে—এমন দাবি সরকার বা আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে করা হয়নি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সমস্যা মূলত খুচরা পর্যায়ে সরবরাহের ঘাটতি এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগকে ঘিরে।

এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি তদন্ত এবং বাজার তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে এলপিজির দামের প্রশ্নটি শুধু আমদানির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; পরিবেশক ও খুচরা বিক্রয়ব্যবস্থার কার্যকারিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বিকল্প উৎস কতটা স্বস্তি দিতে পারে

কাতার থেকে সরবরাহ অনিশ্চিত থাকলে বাংলাদেশকে অন্যান্য উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ বাড়াতে হতে পারে। ওমান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উৎস এবং স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত কার্গো সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস কেনার অর্থ হলো বাড়তি ব্যয়ের সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। শীতকালে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে চাহিদা বাড়লে একই কার্গোর জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ফলে স্বল্পমেয়াদে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা কঠিন।

স্থায়ী সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস জরুরি

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানিনির্ভরতা কমানো। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার বাস্তবতায় নতুন উৎস খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্থলভাগে অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

কারণ গ্যাস সংকটের প্রভাব একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্যাসের সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পরে পণ্য ও সেবার দামেও পড়তে পারে।

সবচেয়ে সরাসরি চাপটি অবশ্য অনুভব করেন সাধারণ মানুষ। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমলে বিকল্প হিসেবে এলপিজি কিনতে হয়, আর বাজারে সেই সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেড়ে গেলে পরিবারের মাসিক ব্যয়ও বাড়ে।

কাতারের এলএনজি সরবরাহ নিয়ে বর্তমান অনিশ্চয়তা তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি আমদানি-সংক্রান্ত সমস্যা নয়। এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে। স্বল্পমেয়াদে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা—এই তিন দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।