,

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়োগে প্রক্সি জালিয়াতি, ভুয়া প্রার্থী আটক

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতারণা ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে সেই পরিচয়ে চাকরিতে যোগদানের চেষ্টা শনাক্ত হওয়ার পর এক ব্যক্তিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয়ের যোগদান কার্যক্রম চলাকালে নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ে এ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এ ঘটনা শনাক্তের পরপরই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য কারও অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে যোগদানের চেষ্টা গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে নিয়োগের প্রতিটি পর্যায়ে পরিচয় ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সাতটি ক্যাটাগরিতে মোট ৩৭টি শূন্য পদে সরাসরি জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ নিয়োগের জন্য প্রার্থীদের প্রাথমিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।

নিয়োগপত্রে উল্লেখিত নির্দেশনা ও শর্ত অনুসরণ করে গত ১ অক্টোবর মোট ৩৪ জন প্রার্থী ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে যোগদানপত্র জমা দেন। যোগদানের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরিচয় যাচাই করা হলেও পরবর্তী সময়ে আরও নিবিড়ভাবে তথ্য পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ অক্টোবর যোগদানকারী কর্মচারীদের ছবি, পরিচয় এবং অন্যান্য নথিপত্র পুনরায় পরীক্ষা করেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এ সময় লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের মো. আব্দুল হাই ও মোসলেহা বেগমের ছেলে মো. মাইদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তার রোল নম্বর ছিল ১৭০০২৭০৭। যাচাইয়ের একপর্যায়ে মৌখিক পরীক্ষার সময় সংরক্ষিত ছবির সঙ্গে যোগদান করতে আসা ব্যক্তির চেহারার উল্লেখযোগ্য অমিল পাওয়া যায়। একই সঙ্গে শারীরবৃত্তীয় পরিচিতিসংক্রান্ত তথ্যেও অসংগতি ধরা পড়ে।

শুধু ছবি বা চেহারার অমিলই নয়, হাতের লেখার নমুনা যাচাই করেও জালিয়াতির গুরুত্বপূর্ণ আলামত পান কর্মকর্তারা। মৌখিক পরীক্ষার সময় নেওয়া হাতের লেখার নমুনার সঙ্গে ওই ব্যক্তির বর্তমান হাতের লেখার মিল পাওয়া যায়নি। ফলে তার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ আরও জোরালো হয়।

পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অন্য যোগদানকারী কর্মচারীদের উপস্থিতিতে ওই ব্যক্তির সঙ্গে মুখোমুখি পরিচয় যাচাই করেন। কিন্তু উপস্থিত কর্মচারীরা তাকে মো. মাইদুল ইসলাম হিসেবে শনাক্ত করতে পারেননি। একইভাবে ওই ব্যক্তিও সেখানে যোগদান করতে আসা অন্য কাউকে চিনতে পারেননি। ছবি, শারীরবৃত্তীয় তথ্য, হাতের লেখার নমুনা এবং পারস্পরিক পরিচয় যাচাইয়ের ফলাফল মিলিয়ে কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হন, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য একজন অংশ নিয়েছিলেন। পরে সেই জালিয়াতির ধারাবাহিকতায় প্রকৃত প্রার্থীর পরিচয় ব্যবহার করে চাকরিতে যোগদানের চেষ্টা করা হয় বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ঘটনাটি শনাক্ত হওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়। শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক মো. আবুল কালামের মাধ্যমে তাকে পুলিশি হেফাজতে দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তবে এ ঘটনায় জড়িত অন্য কেউ রয়েছেন কি না, কিংবা প্রকৃত প্রার্থী এ জালিয়াতির বিষয়ে কতটা অবগত ছিলেন, সে বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজনের হয়ে অন্য ব্যক্তির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। এ ধরনের প্রতারণা প্রশাসনিক নিয়োগব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোনো ধরনের দুর্নীতি, প্রতারণা কিংবা জালিয়াতি গ্রহণ করা হবে না। নিয়োগের প্রতিটি ধাপে পরিচয় যাচাই, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি অব্যাহত থাকবে। সাম্প্রতিক ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম প্রতিরোধে তাদের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করা হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই শেষ ধাপ নয়; নিয়োগপত্র গ্রহণ থেকে শুরু করে যোগদান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে প্রার্থীর পরিচয় ও তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ ঘটনা সেই যাচাইপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।