,

এই মাটির কাছে হার মানতে চাই না

এক জনমে কত দেশ দেখা হলো, কত সমুদ্র পার হওয়া হলো। অচেনা কোনো শহরের রঙিন আলোয় দাঁড়িয়ে অন্য মানুষদের স্বপ্ন বুনতে দেখার অভিজ্ঞতা কম নয়। জীবনের বিভিন্ন সময়ে নিজের কাছের মানুষেরা একে একে দূরদেশে পাড়ি জমিয়েছে। কেউ থিতু হয়েছে তুষারপাতের শহরে, কেউ নীল সমুদ্রের উপকূলে, আর কেউবা বেছে নিয়েছে এমন কোনো দেশ যেখানে ভবিষ্যৎ মানেই অন্তত নিশ্চিত এক আশার আলো।
বিদেশের আলোময় পথ আমাকেও টেনেছিল বারবার। হাতের মুঠোয় ছিল উন্নত জীবনের সুযোগ, স্বাচ্ছন্দ্যময় বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা এবং একটু শান্তিতে শ্বাস নেওয়ার প্রলোভন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পা বাড়ানো হয়নি। যে মাটিতে নিজের প্রথম কান্নার সুর ধ্বনিত হয়েছিল, যে মাটির ধুলো মেখে কেটেছে শৈশবের সোনাঝরা দুপুর, তাকে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই দেশেই মিশে আছে মায়ের আঁচল, বাবার কণ্ঠস্বর, আর দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভালোবাসায় ভরা বিকেলের স্মৃতি। আজ তাঁরা কেউই আর বেঁচে নেই। কিন্তু এই মাটির নিচে, দেশেরই কোনো এক নিরিবিলি প্রান্তরে কবরের অন্ধকারে শুয়ে তাঁরা যেন এখনো প্রিয় সন্তানের ফিরে আসার পথ চেয়ে আছেন।
বিদেশ ঘুরে এসেও তাই চোখের সামনে ভেসে উঠত কেবল নিজের দেশের মাটির রঙ। দেশ তো কেবল মানচিত্রে আঁকা কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; দেশ মানে শেকড়, দেশ মানে অজস্র স্মৃতির বিস্তার, প্রিয় মানুষের কবরের পাশে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা একমুঠো মাটি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের এই দীর্ঘ পথচলাকে বড় অচেনা মনে হয়।
বহুদিন ধরে চোখের সামনে দেখছি মূল্যবোধের অবক্ষয়। নীতির চর্চা থমকে গেছে, সততার জায়গা দখল করেছে অন্যায়। ক্ষমতার লিপ্সায় মান মানুষের রূপ বদলায়, স্বার্থের কাছে বিকিয়ে যায় বিবেক, আর অসত্য আজ রাজপথে জাঁকজমক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। চারপাশে কেবল প্রদর্শনীর উৎসব—কপটতা, হিংসা, অহংকার আর প্রতারণার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা।
এমন পরিবেশে ভালো মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নেন, কোলাহলের নিচে চাপা পড়ে যায় ভদ্রতার মৃদু স্বর। আর যাদের সাধ্য আছে, তারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে কিংবা একটু নিরাপদে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে চলে যান। কিন্তু এই মাটি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলাম কেবল একটি বিশ্বাসের ওপর ভর করে—একদিন হয়তো সব বদলাবে। আমাদের পরের প্রজন্ম একটি নতুন ও আলোকময় সকাল দেখবে। রক্ত, অশ্রু আর ভালোবাসায় সিক্ত এই ভূখণ্ড মানুষকে মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার দেবে। সেই প্রত্যাশাতেই একটা পুরো জীবন পেরিয়ে গেল।
আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, স্বপ্ন দেখার সময়টাও কখন যেন চলে গেছে। বছরের পর বছর ঋতু বদলাল—বসন্ত, বর্ষা আর শরৎ এসে জানালার পাশ দিয়ে চলে গেল, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই পরিবর্তন এলো না। সততা যেখানে বোকামি হিসেবে গণ্য হয় আর শালীনতা যেখানে লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তেমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আসলেই এগিয়েছি?
উঁচু উঁচু অট্টালিকা উঠেছে, শহরের পরিধি বেড়েছে, আলোর রোশনাই বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের ভেতরের নৈতিক আলোটুকু কি নিভে যায়নি? এই উন্নয়ন আর চাকচিক্যের আড়ালে নিজেদের কি আমরা ভুল বোঝাচ্ছি? যে জন্মভূমিকে ভালোবাসে চিরকাল থেকে গেলাম, আজ সেই দেশের বুকেই দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রবাসী মনে হয়। এটি এক করুণ পরিহাস।
সব হারিয়েও দেশকে ঘৃণা করা যায় না। কারণ এই মাটিতেই মিশে আছে শৈশবের দিনগুলো, মা-বাবার পরম স্মৃতি আর জীবনের সমস্ত ভালোবাসা। শরীর ও মন আজ চরম ক্লান্ত। কিন্তু সেই ক্লান্তি ও হতাশার গভীরেও ধুলোবালি জমে থাকা একটি ছোট আশার প্রদীপ এখনো মিটমিট করে জ্বলে। হয়তো এটিই দেশপ্রেম, হয়তো এটিই মানুষের শেষ আস্থা। বিশ্বাস রাখতে ইচ্ছে করে—একদিন এই মাটিতে সততার মূল্যায়ন হবে, মানুষ আবার মানুষকে ভালোবাসবে, আর কোনো সন্তানকে নিরাপদ জীবনের খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমাতে হবে না। সেই দিনটি দেখার জন্য হয়তো বাঁচব না, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের হাসিমুখের মাঝে নিজের এই আত্মত্যাগের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে। মানুষ ও স্বপ্ন একসময় মুছে যায়, কিন্তু জন্মভূমির প্রতি রেখে যাওয়া ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না।
Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।