ঘটনাটি ঘটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের ৩০তম ওভারের শেষ বলে। ভারতের অফ স্পিনার নামান ধিরের বলটি কাট করতে যান বাঁহাতি রাদারফোর্ড। বলটি উইকেটের পেছনে থাকা লোকেশ রাহুলের গ্লাভসে যাওয়ার পর ভারতীয় ক্রিকেটাররা ক্যাচের আবেদন করেন। মাঠের আম্পায়ারও সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে দেন।
রাদারফোর্ড অবশ্য সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তিনি রিভিউ নেন। টেলিভিশন রিপ্লেতে বল ব্যাটের কাছ দিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে স্নিকোমিটারে একটি স্পাইক দেখা যায়। ফলে সিদ্ধান্তটি তৃতীয় আম্পায়ার সৈকতের কাছে যায়। বিভিন্ন রিপ্লে ও প্রযুক্তিগত তথ্য পর্যালোচনার পর তিনি মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এই সিদ্ধান্ত নিয়েই মূল বিতর্কের সূত্রপাত।
রাদারফোর্ডের অবস্থান ছিল, স্নিকোমিটারে যে স্পাইক দেখা গেছে সেটি বল-ব্যাটের সংস্পর্শের কারণে নাও হতে পারে। তার দাবি, ব্যাট ও প্যাডের সংস্পর্শ থেকেও এমন সংকেত তৈরি হতে পারে। টেলিভিশন রিপ্লের কিছু দৃশ্যে ব্যাট ও বলের মধ্যে ফাঁক দেখা যাচ্ছিল বলেও দাবি করেন সিদ্ধান্তটির সমালোচকেরা। ফলে প্রযুক্তিতে পাওয়া তথ্যের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় ২৫ বলে ২৪ রান করে ফিরতে হয় রাদারফোর্ডকে। মাঠ ছাড়ার সময়ও নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই ব্যাটার। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রিকেটপ্রেমীদের একটি অংশ তার পক্ষ নেন।
সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার আকাশ চোপড়াও সিদ্ধান্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, রাদারফোর্ড নট আউট ছিলেন এবং স্নিকোমিটারে দেখা স্পাইকটি ব্যাট ও প্যাডের সংস্পর্শ থেকে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ভারতীয় সাংবাদিক বিক্রান্ত গুপ্তও একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, টেলিভিশন রিপ্লেতে যদি ব্যাট ও বলের মধ্যে ফাঁক দেখা যায়, তাহলে সেই দৃশ্যের সঙ্গে স্নিকোমিটারের সংকেত মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তার মতে, ব্যাট-প্যাডের সংস্পর্শের বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত ছিল।
তবে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত ভারতের হাতে থাকেনি। বরং রাদারফোর্ডের বিদায়ের পরও ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ম্যাচটি জিতে নেয়। ভারতের দেওয়া ৩৫২ রানের লক্ষ্য তারা ১০ বল হাতে রেখেই ৫ উইকেটে অতিক্রম করে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই জয় অবশ্য সিরিজের হিসাব বদলাতে পারেনি। প্রথম দুই ওয়ানডেতে জয়ের কারণে ভারত ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নেয়। অর্থাৎ তৃতীয় ম্যাচে হেরে গেলেও সিরিজ জয় নিশ্চিত ছিল স্বাগতিকদের।
ম্যাচের আগে ব্যাট করে ভারত ৩৫১ রান সংগ্রহ করে। দলটির হয়ে লোকেশ রাহুল ছিলেন সবচেয়ে সফল ব্যাটার। তিনি ৮৭ বলে অপরাজিত ১২৯ রান করেন। রোহিত শর্মা ৮৫ বলে ৯২ রান করেন, আর রুতুরাজ গায়কোয়াড়ের ব্যাট থেকে আসে ৫৭ রান। এই তিন ব্যাটারের বড় ইনিংসেই ভারত তিন শতাধিক রান সংগ্রহের ভিত পায়।
জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান তাড়ার মূল নায়ক ছিলেন অধিনায়ক শাই হোপ। চাপের মুখে অসাধারণ ব্যাটিং করে তিনি ১৪৩ বলে অপরাজিত ১৬২ রান করেন। তার ব্যাটে ভর করেই ক্যারিবীয় দল ৩৫২ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায়। বড় লক্ষ্য তাড়া করে পাওয়া এই জয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য সিরিজের শেষ ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখে।
ম্যাচের ফলাফল তাই একদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বড় রান তাড়ার কারণে আলোচিত হয়েছে, অন্যদিকে আলোচনায় এসেছে আম্পায়ারিংয়ের সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ক্রিকেটে তৃতীয় আম্পায়ারের ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার সময় শুধু একটি প্রযুক্তিগত সংকেত নয়, বিভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও সংশ্লিষ্ট তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়। কোন তথ্যকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেটিই অনেক সময় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।
শরফুদ্দৌলা সৈকতের সিদ্ধান্ত নিয়েও মূল প্রশ্নটি সেখানেই। স্নিকোমিটারে পাওয়া সংকেত এবং ভিডিও রিপ্লেতে দৃশ্যমান অবস্থার মধ্যে যে অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটির ব্যাখ্যা কীভাবে করা হয়েছিল—ক্রিকেটপ্রেমীদের আগ্রহ এখন সেদিকেই।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ম্যাচের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করেনি। রাদারফোর্ড আউট হওয়ার পরও শাই হোপের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত ভারত সিরিজ জিতেছে ২-১ ব্যবধানে, আর নিউ চণ্ডীগড়ের তৃতীয় ওয়ানডে শেষ হয়েছে বাংলাদেশের আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা সৈকতের একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্কের মধ্য দিয়ে।









