কিছু মানুষ শুধু তাঁদের নাম দিয়ে পরিচিত হন না; তাঁদের কণ্ঠ, কাজ ও ব্যক্তিত্বও হয়ে ওঠে একটি সময়ের স্মৃতি। প্রজ্ঞা লাবনী তেমনই এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, লেখালেখি ও শিক্ষকতায় দীর্ঘ পথচলার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন।
আজ ৪ অক্টোবর প্রজ্ঞা লাবনীর জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে ফিরে আসে রেডিওর সেই সময়ের স্মৃতি, যখন সন্ধ্যার পর একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের জন্য শ্রোতারা অপেক্ষা করতেন। রেডিও সেটের সামনে বসে পরিচিত দুটি কণ্ঠ শোনার আনন্দ ছিল অনেকের নিয়মিত অভ্যাস। প্রজ্ঞা লাবনী ও শফি কামালের উপস্থাপনায় রেডিও ম্যাগাজিন ‘উত্তরণ’ তখন শ্রোতাদের কাছে শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না, বরং সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত এক আবেগের নাম হয়ে উঠেছিল।
সময়ের সঙ্গে গণমাধ্যমের ধরন বদলেছে। রেডিওর সেই প্রভাবশালী সময়ও অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু কিছু কণ্ঠ মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়। প্রজ্ঞা লাবনীর কণ্ঠও তেমনই একটি পরিচিত ও মায়াময় অনুরণন, যা বহু শ্রোতার কাছে একটি বিশেষ সময়কে মনে করিয়ে দেয়।
প্রজ্ঞা লাবনীর পরিচয়ের পরিধি অবশ্য বেতারে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি লেখিকা, উপস্থাপিকা, আবৃত্তিশিল্পী, বেতার ব্যক্তিত্ব, অভিনেত্রী, শিক্ষক ও প্রশিক্ষক। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের বিচরণ তাঁকে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।
অভিনয়েও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। আশির দশকের টেলিভিশন নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে এনামুল করিম নির্ঝরের চলচ্চিত্র ‘আহা!’-তে বিশেষ একটি চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রেও নিজের অভিনয়-সত্তার পরিচয় তুলে ধরেন।
প্রজ্ঞা লাবনীর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও ছিল সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত পরিবেশ। তাঁর মা অধ্যাপক, সাহিত্যিক ও প্রয়াত ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুন। তাঁর বাবা একসময় খুলনার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান প্রজ্ঞা লাবনী। অভিনয়জগতের পরিচিত মুখ সুবর্ণা মুস্তাফা তাঁর চাচাতো বোন।
শিক্ষাজীবনেও তাঁর রয়েছে বৈচিত্র্য। হলিক্রস কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেন। পাশাপাশি অর্থনীতিতে এমবিএ অর্জন করেন। শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে আইইউবি, এনএসইউ, ড্যাফোডিল, শান্তা মারিয়াম, ইস্ট ওয়েস্ট ও ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১০ সাল থেকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিল্পী ও শিক্ষক—দুটি ভিন্ন জগতের এই পরিচয়কে একসঙ্গে ধারণ করেছেন প্রজ্ঞা লাবনী। তাঁর পেশাগত জীবনে সৃজনশীলতার পাশাপাশি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে তাঁর দীর্ঘ পথচলায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাও সমানভাবে যুক্ত হয়েছে।
ব্যক্তিজীবনেও প্রজ্ঞা লাবনীর রয়েছে নানা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা। দেশের প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী প্রয়াত কাজী আরিফ ছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গী। তাঁদের চার সন্তান—প্রপা, আনুশা, বৃন্ত ও তেপান্তর।
জীবনের পথ সবসময় একরকম থাকে না। সেখানে আনন্দের পাশাপাশি থাকে বেদনা, সাফল্যের পাশাপাশি থাকে নানা চ্যালেঞ্জ, আর সময়ের সঙ্গে জমা হয় অসংখ্য স্মৃতি। প্রজ্ঞা লাবনীর জীবন ও কর্মজীবনেও সেই বৈচিত্র্যের ছাপ রয়েছে। তবু নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন।
জন্মদিনে তাই তাঁর কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় এক বিস্তৃত পরিসর। একসময় তাঁর কণ্ঠ পৌঁছে গেছে রেডিওর অসংখ্য শ্রোতার ঘরে। পরে অভিনয় ও উপস্থাপনার মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন দর্শকদের সঙ্গে। শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে চলেছেন।
প্রজ্ঞা লাবনীকে ঘিরে তাঁর পরিচিতজনদের বর্ণনায় উঠে আসে নিরহংকার ও উদার মানসিকতার কথাও। তিনি ভ্রমণপ্রিয় এবং মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে যেমন রয়েছে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার দীপ্তি, তেমনি রয়েছে সহজ-সরল মানবিকতার উষ্ণতা।
তাঁর জন্মদিন তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত উদ্যাপনের দিন নয়। এই দিনটি তাঁর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পথচলার স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে। বিশেষ করে যাঁরা রেডিওর সেই সময়ের শ্রোতা ছিলেন, তাঁদের কাছে প্রজ্ঞা লাবনীর নাম একটি পরিচিত কণ্ঠ, একটি প্রিয় অনুষ্ঠান এবং একটি সুন্দর সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
৪ অক্টোবরের এই বিশেষ দিনে প্রজ্ঞা লাবনীর প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। তাঁর আগামী দিনগুলো হোক সুস্থতা, শান্তি ও সৃষ্টিশীলতায় পূর্ণ। কণ্ঠে থাকুক সেই পরিচিত মায়া, কথায় থাকুক প্রজ্ঞার দীপ্তি, আর কাজের মধ্য দিয়ে যুক্ত থাকুক মানুষের ভালোবাসা।
শুভ জন্মদিন, প্রজ্ঞা লাবনী।
আপনার দীর্ঘ পথচলা আরও সমৃদ্ধ হোক। জীবনের প্রতিটি নতুন অধ্যায় নিয়ে আসুক নতুন আনন্দ, প্রশান্তি ও সৃষ্টির সুযোগ। বহু শ্রোতা ও দর্শকের স্মৃতিতে যে কণ্ঠ আজও অনুরণিত, সেই কণ্ঠের জন্য রইল অফুরন্ত শুভকামনা।









