নাটোরের গুরুদাসপুরে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে অপহরণ করে ধর্ষণের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিএনপির সাবেক নেতা মো. ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ জামিনে মুক্তির পর হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নাজিরপুর এলাকায় আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘বিচার’ করার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ফিরোজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, তাঁকে সাজা দেওয়ার পেছনে দুর্নীতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, কয়েকজনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অথচ তাঁর দাবি অনুযায়ী প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্থানীয় অনেক মানুষ সাক্ষ্য দিতে পারেন। নাজিরপুরের মাটিতেই তাদের বিচার হবে বলেও বক্তব্য দেন তিনি।
তবে কার উদ্দেশে তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন, তা বক্তব্যে নির্দিষ্ট করেননি। মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা জানিয়েছেন, জামিনে মুক্তির পর তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান এবং বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেছেন।
মামলার বাদী বলেন, মামলা দায়েরের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে আসামিপক্ষের লোকজনের মাধ্যমে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং আপসের জন্য অর্থের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। মেয়ের ও পরিবারের সম্মানের কথা বিবেচনা করে তিনি মামলা চালিয়ে যান। আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট থাকলেও আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার পর তাঁর উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে তিনি জানান।
আদালতের রায়ে দুই মেয়াদে সাজা
ফিরোজুল ইসলাম গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি নাজিরপুরের দৌলতপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে এবং গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে গিয়েছিল ওই ছাত্রী। অভিযোগ, বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থেকে প্রধান শিক্ষক তাকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান। পরে তাকে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়।
ঘটনার পর ছাত্রীর বাবা গুরুদাসপুর থানায় ফিরোজ ও তাঁর দুই ভাইকে আসামি করে মামলা করেন। একই বছরের ১১ অক্টোবর রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তকীতলার একটি আবাসিক হোটেল থেকে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৫।
মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ছিল। সরকারি কৌঁসুলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং মামলায় উপস্থাপিত ভিডিওসহ বিভিন্ন প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত ফিরোজকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মলহিদুজ্জামান মুহিত ধর্ষণের ধারায় তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপহরণের পৃথক ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। মামলার অপর দুই আসামিকে আদালত খালাস দেন।
এর আগে মামলার একটি নির্ধারিত শুনানিতে হাজির হলে আদালত ফিরোজের জামিন বাতিল করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। রায় ঘোষণার সময়ও তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তিনি কারাগারে ছিলেন প্রায় ১১ মাস।
জামিনের পর সমর্থকদের নিয়ে সমাবেশ
মঙ্গলবার উচ্চ আদালতের আদেশে রাজশাহী কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান ফিরোজ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, তাঁর সমর্থকেরা দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে কারাগারের প্রধান ফটকে যান এবং ফুলের মালা দিয়ে তাঁকে বরণ করেন।
পরে রাতে নাজিরপুর এলাকায় কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে একটি সমাবেশ হয়। সেখানে ফিরোজ নিজের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা ও আদালতের রায় নিয়ে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মামলার বাদীর অভিযোগ, জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাঁকে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ধর্ষণ মামলার বাদীকে অন্যায়ভাবে হুমকি দেওয়া হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একদিকে আদালতের রায়ে দণ্ডিত আসামি আপিলের মাধ্যমে জামিনে মুক্ত হয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মামলার বাদী নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলেছেন। ফলে জামিনের পর দেওয়া বক্তব্য এবং বাদীর নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও বক্তব্যের প্রেক্ষাপট যাচাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি পুলিশের ওপর নির্ভর করছে।









