রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ পদ থেকে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগের পর সংগঠনটির সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তার পদ বাতিল করা হয় বলে তিনটি চিঠি এবং দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্যে জানা গেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী নগর ভবন থেকে ল্যাপটপ চুরি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগ, আর্থিক অনিয়ম এবং নারীদের সঙ্গে অবাধ বিচরণের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তোলা হয়েছিল। এসব অভিযোগের পর প্রথমে তার সাথী পদ স্থগিত করা হয়। পরে অভিযোগের বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারার কথা উল্লেখ করে একই বছরের সেপ্টেম্বরে তাকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠনটি।
সংগঠনটির সাবেক ও বর্তমান সভাপতির স্বাক্ষর করা তিনটি চিঠিতে আম্মারের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সংশ্লিষ্টতা এবং তার পদ বাতিলের সিদ্ধান্তের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সংগঠনের বর্তমান দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতাও এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
চিঠিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি ও রাকসুর সহসভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষর করা একটি চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্যের অভিযোগসহ তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের বিভিন্ন অভিযোগ সংগঠনের নজরে আসে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও রিপোর্টের মাধ্যমে এসব অভিযোগ সম্পর্কে সংগঠনটি জানতে পারে। পরে ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শাখা ছাত্রশিবিরের মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় অভিযোগগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
ওই সভায় আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সাংগঠনিকভাবে আমলে নিয়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তার সাথী পদ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগের বিষয়ে তার ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এরপর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির তার সাথী পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। একই মাসের ১৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষর করা আরেকটি চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং একাধিকবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও পরিবর্তন না আসায় আম্মারের সাথী পদ বাতিল করা হয়েছে।
চলতি বছরের ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের বর্তমান সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষর করা আরেকটি চিঠিতেও আগের সিদ্ধান্তগুলোর উল্লেখ করা হয়। সেখানে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আম্মারের অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো মন্তব্য কিংবা প্রতিক্রিয়া না দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই চিঠিতে রাকসুর নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আম্মারের দাপ্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ রাখা হলেও অন্য নেতা-কর্মীদের তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার অনুরোধ করা হয়। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার সঙ্গে সাধারণ সাংগঠনিক যোগাযোগও সীমিত রাখার অবস্থান নেওয়া হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান আম্মারের সঙ্গে সংগঠনটির পূর্ববর্তী সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করা হলে সাধারণত এ ধরনের তথ্য প্রকাশ্যে আনার নিয়ম নেই। তার ভাষ্য, আম্মার তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় পড়ার সময় ছাত্রশিবিরের সাথী পদে যুক্ত ছিলেন। পরে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার সংশ্লিষ্টতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় স্থানান্তর করা হয়।
মেহেদী হাসানের দাবি, জুলাই আন্দোলনের সময় আম্মারকে বিভিন্নভাবে প্রটোকল ও আশ্রয় দিয়েছিল ছাত্রশিবির। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অনিয়ম এবং ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ জবাব দিতে না পারায় সেপ্টেম্বরে তাকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে তিনি জানান। সংগঠন থেকে বহিষ্কারের পর আম্মারের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের আর কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনটির এক দায়িত্বশীল নেতাও তিনটি চিঠির তথ্য সঠিক বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, আম্মার ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পদ বাতিলের পর তার সঙ্গে সংগঠনের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
তবে আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার নিজের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বর্তমানে সালাহউদ্দিন আম্মার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তার অতীত সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা, পদ স্থগিত ও পরবর্তী সময়ে পদ বাতিলের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে চিঠিতে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক প্রক্রিয়ার ফল বিবেচনা করা প্রয়োজন।









