ভারতের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আইর্ডাইয়ের (IRDAI) নতুন কিছু কঠোর নীতিগত প্রস্তাবের কারণে এক দিনে বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে দেশটির বিমা কোম্পানিগুলো। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্স কোম্পানি (এনবিএফসি) এবং জীবন বিমা খাতের শেয়ারগুলো বৃহস্পতিবারের লেনদেনের শুরুতে বড় ধরনের বিক্রির চাপে পড়ে, যা একপর্যায়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নিচে নেমে যায়।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জনপ্রিয় ফিনটেক প্রতিষ্ঠান পিবি ফিনটেক বা পলিসি বাজারের শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ কমে এর নিম্ন সার্কিট বা সর্বনিম্নে (১৫০৯ রুপি) গিয়ে ঠেকে। একই সঙ্গে ম্যাক ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস, কানাড়া এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং এলঅ্যান্ডটি ফাইন্যান্সের শেয়ারের দাম ১২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। সদ্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ফিনটেক প্রতিষ্ঠান টার্টলমিন্ট ফিনটেক সলিউশনসও ২০ শতাংশ দর হারিয়ে ১০৯ টাকা ১০ পয়সায় নেমে আসে, যা গত জুন মাসে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে তাদের সর্বকালের সর্বনিম্ন দর।
আইসিআইসিআই প্রুডেন্সিয়াল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চোলামন্ডলম ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইনফো এজ, বাজাজ ফাইন্যান্স, অ্যাক্সিস ব্যাংক এবং বাজাজ ফিনসার্ভের মতো বড় ও শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরও ৩ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে হ্রাস পায়। এর প্রভাবে সেদিন সকালের দিকে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) প্রধান সূচক সেনসেক্স শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ৭৪ হাজার ২৮৪ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।
বীমা খাতের শেয়ারে হঠাৎ এই রক্তক্ষরণের মূল কারণ হিসেবে দেখা গেছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আইর্ডাইয়ের একটি নতুন সিদ্ধান্ত। গত বুধবার বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের (Expenses of Management বা EoM) সীমা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার একটি প্রস্তাব পেশ করে সংস্থাটি। নতুন এই প্রস্তাব অনুযায়ী, জীবন বিমা কোম্পানিগুলোকে আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের কোম্পানির সার্বিক ব্যবস্থাপনা ব্যয় মোট প্রত্যক্ষ প্রিমিয়াম আয়ের (GDPI) ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে তা কমিয়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নামাতে হবে।
আইর্ডাইয়ের এই নতুন কনসালটেশন পেপারে কেবল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানোই নয়, বরং বিভিন্ন পণ্য ও বিপণন চ্যানেলের ওপর নতুন করে কমিশন বা পারিশ্রমিকের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়ন্ত্রণমূলক কঠোর পদক্ষেপের কারণে বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশনভিত্তিক আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা বিমা ও সংশ্লিষ্ট খাতের শেয়ার বিক্রি করে দিতে শুরু করেন।
বিমা খাতের প্রধান শেয়ারগুলোর দরপতন ও পরিবর্তনের পরিসংখ্যান
| ক্রমিক | কোম্পানির নাম বা সূচক | বাজারভিত্তিক অবস্থান ও ধসের বিবরণ |
| ১ | পিবি ফিনটেক (পলিসি বাজার) | সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ কমে সর্বনিম্ন সার্কিট সীমায় পৌঁছায় |
| ২ | ম্যাক ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস | ইন্ট্রা-ডে লেনদেনে ১২ শতাংশ পর্যন্ত দরপতন |
| ৩ | কানাড়া এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স | উল্লেখযোগ্য চাপে পড়ে দ্ব্যঙ্কের ঘরে পতন |
| ৪ | এলঅ্যান্ডটি ফাইন্যান্স | ঋণ ও বিনিয়োগ খাতের শেয়ারে ১২ শতাংশ পর্যন্ত পতন |
| ৫ | টার্টলমিন্ট ফিনটেক সলিউশনস | ২০ শতাংশ পতন ঘটে তালিকাভুক্তির পর সর্বনিম্নে নামে |
| ৬ | আইসিআইসিআই প্রুডেন্সিয়াল লাইফ | ৩ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে দরপতন ঘটে |
| ৭ | এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স | সামগ্রিক খাতের পতনের টানে ৩ থেকে ৮ শতাংশ হ্রাস |
| ৮ | বাজাজ ফাইন্যান্স ও বাজাজ ফিনসার্ভ | বিক্রি বাড়ায় শেয়ারের দামে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব |
| ৯ | অ্যাক্সিস ব্যাংক ও চোলামন্ডলম | ব্যাংক ও এনবিএফসি খাতে ৩ থেকে ৮ শতাংশ পতন |
| ১০ | বিএসই সেনসেক্স সূচক | সামগ্রিক বাজারের মন্দার প্রভাবে শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ পতন |
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, আইর্ডাইয়ের এই উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে বীমা খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং গ্রাহকদের জন্য ব্যয় কমাতে সহায়তা করলেও স্বল্প মেয়াদে এটি বিমা কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা অর্জনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। নীতিমালার রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার আগে বিনিয়োগকারীরা তাই বেশ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।









