রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীমকে (২৪) গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় চালকের আসনে থাকা কিশোর আজান আলী শরীফের (১৭) পরিবারের সঙ্গে নিহতের পরিবারের ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) আদালতে মামলার শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন এ তথ্য জানান।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। নিহতের পরিবার এই সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছে এবং আসামির জামিন বা খালাসের বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলেও জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি জোনের ১ নম্বর সড়কে। ওই সময় একটি নির্মাণাধীন স্থাপনার কাছে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
ঘটনার পর সেখানে উপস্থিত লোকজন গাড়িটির চালকের আসনে থাকা কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
এরপর দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ এবং ছড়িয়ে পড়া ভিডিও পর্যালোচনা করে গাড়িটি কে চালাচ্ছিলেন, তা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। পুলিশ জানায়, গাড়ির চালকের আসনে ছিলেন আজান আলী শরীফ। পরবর্তী সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার শুরুতেও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। প্রথমে দায়ের করা মামলায় গাড়ির চালক হিসেবে আকাশ মারক নামে একজনকে আসামি করা হয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসার পর গাড়ি চালানোর সময়কার ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আজান আলী শরীফের বয়স ১৭ বছর। সে গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়িটি তার মায়ের নামে নিবন্ধিত বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে। মামলায় নাম থাকা অন্য আসামি আকাশ মারককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার মামলার শুনানির জন্য আসামিদের ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারকের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানেই দুই পক্ষের মধ্যে আপসের বিষয়টি আদালতের সামনে আসে। আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, সমঝোতার ৯ লাখ টাকা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। বাদীপক্ষ আসামিদের জামিন বা খালাসের বিষয়ে আপত্তি করবে না বলেও তিনি জানান।
একজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় অর্থের বিনিময়ে আপসের বিষয়টি সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ৯ লাখ টাকা কোনো প্রাণহানির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, নিহত ব্যক্তি প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সিদ্ধান্তে আপসে সম্মত হয়েছেন। তারা এই সমঝোতায় সন্তুষ্ট বলেও আইনজীবীর দাবি।
তবে দুই পক্ষের মধ্যে আর্থিক সমঝোতা হয়েছে বলেই মামলার সব আইনি প্রশ্নের অবসান হচ্ছে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। মামলাটি কোন ধারায় পরিচালিত হবে, আদালত আপসের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করবেন এবং আসামিদের জামিন বা পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে কী সিদ্ধান্ত হবে, তা আদালতের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
আইনজীবী জানিয়েছেন, মামলাটির পরবর্তী শুনানি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এ হবে।
মেহেদীর মৃত্যুর ঘটনায় আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে—রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিক ও ফুটপাতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত। ফুটপাত সাধারণত পথচারীদের চলাচলের জায়গা হলেও বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজের কারণে শ্রমিকদের সেখানে বসে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। এমন অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ হারানো কোনো যানবাহন ফুটপাতে উঠে গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়।
বারিধারার এই ঘটনায় গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণ, চালকের বয়স ও পরিচয়, দুর্ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপ এবং মামলার তদন্ত—সবকিছুই এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর্থিক সমঝোতার পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণের বিষয়টিও পরবর্তী কার্যক্রমে গুরুত্ব পাবে।









