বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক লিটন দাস প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে মাঠে নামতে যাচ্ছেন। অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে তোলার পাশাপাশি দেশের জন্য একটি লালিত স্বপ্ন পূরণের বড় দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের মিশেলে গড়া দলকে সাথে নিয়ে এবার তার স্পষ্ট লক্ষ্য—বাংলাদেশের ঝুলিতে আরেকটি ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক এনে দেওয়া।
এশিয়ান গেমসের ক্রিকেট মঞ্চে বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস যথেষ্ট উজ্জ্বল। ২০১০ সালের গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে আফগানিস্তানকে হারিয়ে পুরুষ ক্রিকেট দল পেয়েছিল স্বর্ণের স্বাদ, যা এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে বাংলাদেশের একমাত্র সোনা। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ইনচন ও ২০২৩ সালের হাংঝৌ গেমসে পুরুষ দলকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ব্রোঞ্জপদক নিয়ে। অন্যদিকে নারী ক্রিকেট দলও পিছিয়ে নেই; তারা দুটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ জিতেছে। ২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপের সঙ্গে সময়সূচির সাংঘর্ষিকতার কারণে জাতীয় দলের মূল সারির খেলোয়াড়দের অনেকেই আগের আসরে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তাই এবার লিটন দাসের নেতৃত্বে পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামছে বাংলাদেশ।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের রোমাঞ্চ প্রকাশ করে লিটন দাস বলেন, দীর্ঘদিন জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হলেও এশিয়ান গেমসের পরিবেশ একেবারে ভিন্ন। যেকোনো প্রতিযোগিতায় জয়ের লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ মাঠে নামে, তবে এবার দলের স্বপ্ন পুরো ভিন্ন এক উচ্চতায়। প্রতিটি সদস্যই এই সফর নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছেন। ব্যক্তিগতভাবে অধিনায়ক হিসেবে এই গেমসে সর্বোচ্চ সাফল্য নিশ্চিত করাকেই মূল লক্ষ্য বলে মনে করছেন তিনি।
লিটনের এই চিন্তাধারা কেবল এশিয়ান গেমসের পদক জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এই আসরকে বড় একটি প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এশিয়ান গেমসের মতো বহুজাতিক প্রতিযোগিতায় ইতিবাচক ফল করা সম্ভব হলে তা অলিম্পিক মঞ্চে ভালো করার আত্মবিশ্বাস দেবে। একই সাথে ক্রিকেটের এই সাফল্য দেশের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে।
অবশ্য স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবতাও স্পষ্ট। চলতি ২০২৬ সালে বাংলাদেশ দল সংক্ষিপ্ত সংস্করণের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। বছরের আটটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মধ্যে জয়ের মুখ দেখেছে মাত্র তিনটিতে। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেছে তারা, যার মধ্যে গত জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়টি ছিল স্বস্তির।
এই ঘাটতি পূরণে ঢাকার নিবিড় অনুশীলন ক্যাম্প, পরিকল্পিত প্রস্তুতি ম্যাচ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ক্রিকেটারদের প্রতিনিয়ত অংশগ্রহণকে ইতিবাচক ভূমিকা হিসেবে দেখছেন অধিনায়ক। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক পরিসরের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে যত বেশি বাংলাদেশি খেলোয়াড় সুযোগ পাবেন, দেশের ক্রিকেটের ভিত ততই মজবুত হবে। অতীতে সাকিব আল হাসান কিংবা মুস্তাফিজুর রহমানের মাধ্যমে বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের পরিচয় বিস্তৃত হয়েছিল, ঠিক একইভাবে নতুন ক্রিকেটারদের জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।
দলের সাম্প্রতিক স্কোয়াড ভাবনা নিয়ে লিটন জানান, টি-টোয়েন্টিতে লোয়ার-মিডল অর্ডারের ব্যাটিং ধারাবাহিকতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। মিডল অর্ডার ব্যাটার ইয়াসির আলী রাব্বি জিম্বাবুয়ে সফরে ভালো পারফর্ম করে দলে নিজের অবস্থান আবার পোক্ত করেছেন। তাকে আরও পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি হাতে থাকা তিন-চারটি বিকল্প পরখ করে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে দলের। প্রতিপক্ষ ও পিচের কন্ডিশন বিবেচনাতেই সেরা ব্যাটার বেছে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে লিটনের ক্রীড়ানুরাগ কেবল ক্রিকেটে সীমাবদ্ধ নয়। গেমসের ফাঁকে অলিম্পিক ভিলেজে বিভিন্ন দেশের অ্যাথলেটদের সাথে মতবিনিময় এবং অন্যান্য ইভেন্ট সরাসরি দেখার সুপ্ত ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। পেশাদার খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতি ও শৃঙ্খলা থেকে নতুন অভিজ্ঞতা শেখার এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না বাংলাদেশ অধিনায়ক।
আসরের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশ স্কোয়াডে একটি পরিবর্তন এসেছে। হ্যামস্ট্রিংয়ের ইনজুরির কারণে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছেন অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডে প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়েছেন ২৯ বছর বয়সী রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম।
নতুন এবং অভিজ্ঞদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মূল লক্ষ্য এখন ২০১০ সালের সেই ঐতিহাসিক অর্জনকে স্পর্শ করা। অধিনায়ক লিটন দাসের নেতৃত্ব ও দৃঢ়তাই হতে পারে এশিয়ান গেমসে নতুন ইতিহাস গড়ার মূল চাবিকাঠি।









