ভারতের তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা সংস্থাকে আর্থিক সংকট থেকে বের করে আনতে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। তবে এবার শুধু বিপুল অঙ্কের মূলধন জোগান দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাটতি পূরণের পথে হাঁটতে চাইছে না সরকার। বরং ব্যবসা পরিচালনা, আন্ডাররাইটিং, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সক্ষমতায় দৃশ্যমান উন্নতি করতে পারলেই পরবর্তী সময়ে কত অর্থ এবং কখন দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
ভারতের ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (NICL), ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (OICL) এবং ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (UICL)—এই তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা সংস্থাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘Business Standard’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় আন্ডাররাইটিং ব্যবস্থার সংস্কার, নতুন বিমা পণ্য চালু এবং কর্মীদের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের নতুন অবস্থানের পেছনে রয়েছে তিন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা। বিপুল সরকারি মূলধন পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমেনি; বরং সলভেন্সি পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে অর্থ সহায়তা দেওয়ার আগে সংস্থাগুলোর পরিচালনাগত দুর্বলতা কতটা কমছে এবং ব্যবসার মৌলিক কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিপুল মূলধন পেয়েও কাটেনি সংকট
২০২০ থেকে ২০২২ অর্থবছরের মধ্যে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে ভারত সরকার মোট ১৭ হাজার ৪৫০ কোটি রুপি মূলধন দিয়েছিল। এর মধ্যে ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স পেয়েছিল ৯ হাজার ২৭৫ কোটি রুপি। ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্সকে দেওয়া হয়েছিল ৪ হাজার ৪২০ কোটি এবং ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনস্যুরেন্স পেয়েছিল ৩ হাজার ৭৫৫ কোটি রুপি।
তবে এই বড় অঙ্কের সহায়তার পরও তিন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। ২০২৬ অর্থবছরের শেষে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার সলভেন্সি রেশিও এক বছর আগের মাইনাস ৬৫ শতাংশ থেকে কমে মাইনাস ১৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তাদের সলভেন্সি রেশিও মাইনাস ৬৭ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে মাইনাস ১১১ শতাংশ।
ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্সের অবস্থা আরও দুর্বল হয়েছে। এক বছর আগে প্রতিষ্ঠানটির সলভেন্সি রেশিও ছিল মাইনাস ১০৩ শতাংশ, যা ২০২৬ অর্থবছরের শেষে নেমে দাঁড়িয়েছে মাইনাস ১৬৩ শতাংশে।
বিমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে সলভেন্সি রেশিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ভবিষ্যতে গ্রাহকদের বিমা দাবি এবং অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধের মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে কি না, সেটি মূল্যায়নে এই অনুপাত ব্যবহৃত হয়। ভারতের বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া (IRDAI) বিমা কোম্পানিগুলোর জন্য ন্যূনতম ১৫০ শতাংশ সলভেন্সি রেশিও নির্ধারণ করেছে।
এই অবস্থায় তিন প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক সলভেন্সি রেশিও তাদের আর্থিক চাপের মাত্রা স্পষ্ট করে তুলেছে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টেও তিন বিমা সংস্থার আর্থিক অবস্থার অবনতিকে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান নিউ ইন্ডিয়া অ্যাস্যুরেন্স এখনও লাভজনক অবস্থায় রয়েছে।
আন্ডাররাইটিং লোকসানেও বড় চাপ
তিন বিমা সংস্থার সংকট শুধু সলভেন্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের মূল বিমা ব্যবসা থেকেও বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে।
২০২৬ অর্থবছরে সরকারি খাতের মাল্টিলাইন সাধারণ বিমা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত আন্ডাররাইটিং লোকসান আগের বছরের তুলনায় ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২৯ হাজার ৭০ কোটি ৫৭ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে।
এর মধ্যে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার আন্ডাররাইটিং লোকসান এক বছরে ১১৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৩৩৫ কোটি ৭০ লাখ রুপি। ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্সের লোকসান ৮৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩০৭ কোটি ৭৭ লাখ রুপিতে। ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সের আন্ডাররাইটিং লোকসানও প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৬২৫ কোটি ১৬ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে।
আন্ডাররাইটিং মূলত বিমা ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়াম দিয়ে দাবি পরিশোধ ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় মেটানোর পর প্রতিষ্ঠানটি কতটা আর্থিকভাবে টেকসই অবস্থায় রয়েছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই সূচক গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে আন্ডাররাইটিংয়ে লোকসান থাকলে তা বিমা কোম্পানির মূলধন ও সলভেন্সির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যৎ অর্থ সহায়তায় নজর থাকবে কর্মদক্ষতায়
নতুন পরিকল্পনায় সরকারি অর্থ সহায়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতাকে সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে। আগামী কয়েক প্রান্তিকে তিন বিমা সংস্থার আর্থিক ও পরিচালনাগত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পরবর্তী মূলধন সহায়তার পরিমাণ এবং সময় নির্ধারণ করা হবে।
এ জন্য ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার ব্যবস্থাও জোরদার করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু কত টাকা প্রয়োজন, সেই হিসাবের বদলে অর্থ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কার্যক্রম কতটা উন্নত করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার এককালীন মূলধন সহায়তার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে।
NSE শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা
তিন প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (NSE) শেয়ার বিক্রিও আর্থিক পুনর্গঠনের অংশ হতে পারে। তিন বিমা সংস্থা মিলিয়ে এনএসইর ৯ কোটি শেয়ার রয়েছে।
এর মধ্যে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার শেয়ার প্রতি শেয়ার ১ হাজার ৭৮৫ রুপি দরে বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আগে ১ কোটি ৮০ লাখ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। পরে প্রস্তাবিত শেয়ারের পরিমাণ কমানো হয়।
এই শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপ সামাল দিতে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। তবে তাদের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ যে বড়, তা বিভিন্ন হিসাবেই উঠে এসেছে।
রেটিং সংস্থা Icra-এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান পরিচালনাগত ও সলভেন্সির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সলভেন্সি রেশিও অর্জনের জন্য তিন বিমা সংস্থার ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি রুপি প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তনের উদ্যোগ
সরকারের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় শুধু অর্থের জোগান নয়, বিমা ব্যবসার মূল কাঠামোতেও পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকের ঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করে বিমা পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তিনির্ভর আন্ডাররাইটিং এবং নতুন পণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে যেসব গ্রাহক ও বাজার এখনও পর্যাপ্ত বিমা সুরক্ষার আওতায় আসেনি, তাদের জন্য নতুন ধরনের পণ্য তৈরির সুযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার পাশাপাশি ঝুঁকি অনুযায়ী বিমা কভারেজ নির্ধারণের সুযোগ বাড়তে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচলিত অ্যাকচুয়ারিয়াল মডেলের পাশাপাশি AI ব্যবহার করে গ্রাহকের ঝুঁকি ও প্রোফাইল বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। একই ধরনের বিমা সুরক্ষা বজায় রেখে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কীভাবে কমানো যায়, সেটিও প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
কৃষিবিমার মতো সরকারি প্রকল্পেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আবহাওয়াসংক্রান্ত ইন্টারনেট অব থিংস বা IoT ডেটা এবং স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করলে আবহাওয়া ও কৃষিজ উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি বিশ্লেষণে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
দক্ষ কর্মী ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ
তিন প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় মানবসম্পদের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারতের বিমা বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখা রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থাগুলোর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
লোকসানের কারণে কর্মীদের পারিশ্রমিক ও প্রণোদনার সুযোগ সীমিত থাকাও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে কর্মীদের কর্মদক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিমা ব্যবসায় ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অ্যাকচুয়ারিয়াল হিসাব, প্রযুক্তিনির্ভর আন্ডাররাইটিং ও দাবি ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল প্রয়োজন। তাই আর্থিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি মানবসম্পদ ধরে রাখার বিষয়টিও তিন প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঁচ বছরে নিট লোকসান ৩১ হাজার কোটি রুপির বেশি
General Insurance Council-এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার সম্মিলিত নিট লোকসান হয়েছে ৩১ হাজার ২০০ কোটি ৮৬ লাখ রুপি। শুধু ২০২৬ অর্থবছরেই তাদের সম্মিলিত নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৪৩৪ কোটি ৩৮ লাখ রুপি, যা ওই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
একই সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট ইনকার্ড ক্লেইমস রেশিও ধারাবাহিকভাবে ১০০ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল। অর্থাৎ দাবি পরিশোধের চাপ তাদের ব্যবসার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে—আরও অর্থ দেওয়ার আগে তিন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বাস্তব পরিবর্তন আনা। আন্ডাররাইটিং লোকসান কমানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, পরিচালনাগত দুর্বলতা দূর করা এবং দক্ষ কর্মী ধরে রাখার মতো বিষয়গুলোকে তাই ভবিষ্যৎ মূলধন সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
আগের মতো শুধু সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর না করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে নেওয়াই এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। আগামী কয়েক প্রান্তিকে তাদের আর্থিক ও পরিচালনাগত ফলাফল সেই পরিকল্পনার অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে।









