,

প্রসববেদনায় হাসপাতালে মা, জানেন না মেয়ের মৃত্যুর খবর

বাড়ির পাশের ঝোপ থেকে সাত বছর বয়সী এক শিশুর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, শিশুটির মা বর্তমানে সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তিনি জানেন না যে তাঁর নিখোঁজ মেয়ের লাশ উদ্ধার হয়েছে। তিনি এখনো মনে করছেন, তাঁর সন্তান নিখোঁজ রয়েছে এবং হয়তো কোথাও থেকে ফিরে আসবে।

স্থানীয় সূত্র, শিশুটির পরিবার ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে অন্তঃসত্ত্বা মা তাঁর বাবার বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল সাত বছর বয়সী মেয়েটিরও। কিন্তু মায়ের আগেই শিশুটি হাতে মাংসের একটি পোঁটলা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। পরে মা তাঁর বাবার বাড়িতে পৌঁছে জানতে পারেন, মেয়ে সেখানে যায়নি। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু করেন।

এর মধ্যেই মায়ের প্রসববেদনা বেড়ে গেলে তাঁকে জেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফলে মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষা এবং মায়ের চিকিৎসা—দুটি বিষয় একই সময়ে চলতে থাকে। শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর বাড়ির কাছের ঝোপঝাড়পূর্ণ একটি এলাকা থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

শিশুটির মামা জানান, তাঁর বোনকে এখনো মেয়ের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় এমন সংবাদ জানালে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়টিও পরিবারের কাছে উদ্বেগের হয়ে উঠেছে। তাই তাঁকে আপাতত জানানো হয়নি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিহত শিশুটি নবীনগরের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত। দুই বোনের মধ্যে সে ছিল বড়। তার বাবা ঢাকায় একটি বেকারিতে কাজ করেন। মা দুই মেয়েকে নিয়ে গ্রামে থাকতেন। পরিবারের স্বাভাবিক জীবন হঠাৎ করেই শিশুটির নিখোঁজ হওয়া এবং পরে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গভীর সংকটে পড়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, লাশ উদ্ধারের সময় সেটি অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল। পচনের কারণে শরীর ফুলে গিয়েছিল এবং মুখমণ্ডল কালো হয়ে গিয়েছিল। ঘটনাস্থলে শিশুটির একটি স্যান্ডেল পাওয়া গেছে। যে জায়গা থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি অনেকটা জঙ্গলের মতো হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা আগে সেখানে খোঁজ করেননি।

নবীনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব কান্তি দাস জানান, সুরতহাল প্রতিবেদনে লাশের পচন ও মুখমণ্ডলের পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া স্যান্ডেলটিও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদি হাসান বলেন, লাশ অর্ধগলিত হয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে থাকতে পারে। ঘটনাস্থলে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে তাঁর ধারণা, শিশুটিকে অন্য কোথাও হত্যা করে পরে ওই স্থানে লাশ ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে। লাশ কোনো সময় বস্তাবন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মৃত্যুর প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর মৃতদেহে পচনসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন শুরু হতে পারে। এ কারণেই শিশুটির শরীর ফুলে যাওয়া এবং মুখমণ্ডল কালো হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের ফলাফল প্রয়োজন।

শিশুটির লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। পুলিশ বলছে, লাশ উদ্ধারের স্থানটিতে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। ফলে শিশুটি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কোথায় গিয়েছিল, কারা তাকে দেখেছিল এবং তার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ জানান, শিশুটি মাংস নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। সেই মাংসেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর যারা শিশুটিকে দেখেছেন, তাদের পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলা হবে। নিখোঁজ হওয়ার সময় শিশুটির চলাফেরা, শেষবার কোথায় দেখা গিয়েছিল এবং এরপর কীভাবে সে বাড়ির কাছের ওই নির্জন স্থানে পৌঁছাল—তদন্তে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে শিশুটির মৃত্যুর কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।