দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ দুজনের মৃত্যুর পর চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৮ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজনই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। রাজধানীর এই অংশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় নগরীর মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।
নতুন আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তির পরিসংখ্যানেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণের বিস্তৃতি দেখা যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৪১৪ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ১৯৪ জন। খুলনায় ২৫৮, বরিশালে ১৭৭, রাজশাহীতে ৮২, ময়মনসিংহে ৫৪, রংপুরে ৪৭ এবং সিলেট বিভাগে ছয়জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এই হিসাবে সবচেয়ে বেশি নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এরপর খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের অবস্থান। শুধু রাজধানী বা আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে নয়, দেশের অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন—সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য সেই চিত্রই তুলে ধরছে।
৬০ হাজার ছাড়িয়েছে মোট হাসপাতালে ভর্তি
চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৩৭৯ জনে। অর্থাৎ বছরের নয় মাস শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬০ হাজারের সীমা অতিক্রম করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা শেষে ১ হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৬ হাজার ৭০ জন।
তবে নতুন ভর্তি ও ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর সংখ্যা সমান হলেও এর অর্থ এই নয় যে একই ১ হাজার ২৩২ জন রোগী ওই সময়ের মধ্যে ভর্তি হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। দুটি সংখ্যা পৃথকভাবে গত ২৪ ঘণ্টার ভর্তি ও ছাড়পত্রের হিসাব নির্দেশ করে।
আগের দুই বছরের তুলনায় পরিস্থিতি
ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে আগের বছরের পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। ওই বছর রোগটিতে মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের।
এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। সে বছর মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৭৫। ফলে গত দুই বছরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল।
চলতি বছরের পরিসংখ্যান এখনো পূর্ণ বছরের নয়। তাই ২০২৬ সালের সঙ্গে ২০২৪ বা ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ বছরের পরিসংখ্যান সরাসরি তুলনা করলে সময়ের পার্থ্যক্যটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তবে সেপ্টেম্বরেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ডেঙ্গুর চাপ যে বড়, তা স্পষ্ট।
এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ জরুরি
ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন স্থাপনা কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এ ক্ষেত্রে প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।
শহরাঞ্চলে ঘনবসতি, নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার সুযোগ থাকায় মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই শুধু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে মশার বংশবিস্তার কমানোর উদ্যোগও চালিয়ে যেতে হয়।
জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা কিংবা ডেঙ্গুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা, সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল অপসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি।
সর্বশেষ হিসাব বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬০ হাজার ৩৭৯ জন। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ফলে রোগী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়াই এখন বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি | ১,২৩২ জন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু | ২ জন |
| চলতি বছরে মোট হাসপাতালে ভর্তি | ৬০,৩৭৯ জন |
| চলতি বছরে মোট মৃত্যু | ১৭৮ জন |
| চলতি বছরে ছাড়পত্র পাওয়া রোগী | ৫৬,০৭০ জন |
| ঢাকা বিভাগে নতুন ভর্তি | ৪১৪ জন |
| ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন ভর্তি | ৫৪ জন |
| চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন ভর্তি | ১৯৪ জন |
| খুলনা বিভাগে নতুন ভর্তি | ২৫৮ জন |
| বরিশাল বিভাগে নতুন ভর্তি | ১৭৭ জন |
| রাজশাহী বিভাগে নতুন ভর্তি | ৮২ জন |
| রংপুর বিভাগে নতুন ভর্তি | ৪৭ জন |
| সিলেট বিভাগে নতুন ভর্তি | ৬ জন |
| ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি | ১,০২,৮৬১ জন |
| ২০২৫ সালে মৃত্যু | ৪১৩ জন |
| ২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি | ১,০১,২১৪ জন |
| ২০২৪ সালে মৃত্যু | ৫৭৫ জন |









