,

জুবিন গার্গকে হারানোর এক বছর, থামেনি মৃত্যুর রহস্য

কিংবদন্তি ভারতীয় সংগীতশিল্পী জুবিন গার্গের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হলো শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর)। ২০২৫ সালের এই দিনে সিঙ্গাপুরের লাজারাস আইল্যান্ডের কাছে সাঁতার কাটার সময় পানিতে অচেতন হয়ে পড়ার পর ৫২ বছর বয়সে মারা যান আসামের এই বহুমুখী শিল্পী। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় আসাম। এক বছর পরও গান, স্মৃতি ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ভক্তদের কাছে বেঁচে আছেন জুবিন। তবে তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের পুরোপুরি অবসান হয়নি। সিঙ্গাপুরে মৃত্যুকে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে যাওয়া বলা হলেও আসামে সাতজনকে আসামি করে হত্যা মামলার বিচার চলছে।

মৃত্যুর এক বছর, দুই তদন্তের দুই ব্যাখ্যা

জুবিনের মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে সিঙ্গাপুর ও ভারতের তদন্তে ভিন্ন অবস্থান সামনে আসে। সিঙ্গাপুরের স্টেট করোনার ২০২৬ সালের ২৫ মার্চের রায়ে মৃত্যুকে দুর্ঘটনাজনিত পানিতে ডুবে যাওয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। করোনারের অনুসন্ধানে জোরপূর্বক পানিতে ফেলে দেওয়া, উদ্ধারকাজে বিলম্ব বা অন্য কোনো ধরনের অপরাধমূলক হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিঙ্গাপুর পুলিশও ফাউল প্লের সম্ভাবনা নাকচ করে তদন্ত শেষ করে।

সিঙ্গাপুরের তদন্তে বলা হয়, জুবিন একটি ব্যক্তিগত ইয়টে ছিলেন এবং লাজারাস আইল্যান্ডের কাছে পানিতে নামার পর দ্বিতীয়বার সাঁতার কাটতে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে সিপিআর দেওয়া হয়েছিল। পরে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তদন্তে তাঁর রক্তে উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু আসামে ঘটনাটি অন্য পথে এগোয়। মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্যজুড়ে ৬০টির বেশি এফআইআর হওয়ার পর বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি গঠন করা হয়। তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনাটি ফৌজদারি মামলায় রূপ নেয় এবং পরে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সাতজনের বিরুদ্ধে চলছে বিচার

আসাম পুলিশের গ্রেপ্তার করা সাতজনের মধ্যে রয়েছেন নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া ফেস্টিভ্যালের আয়োজক শ্যামকানু মহন্ত, জুবিনের ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মা, সংগীতশিল্পী অমৃতপ্রভা মহন্ত ও শেখর জ্যোতি গোস্বামী, জুবিনের চাচাতো ভাই সন্দীপন গার্গ এবং তাঁর দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা, অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এসআইটি পরে প্রায় আড়াই হাজার পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দেয়। সংযুক্ত নথিসহ মামলার কাগজপত্রের পরিমাণ ১২ হাজার পৃষ্ঠার বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের মে মাসে বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তাঁদের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে হত্যা-সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ গঠন বিচার শুরুর একটি ধাপ; এর অর্থ আদালত তখনো কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। মামলার সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

এরই মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণও শুরু হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩৯৪ জন সম্ভাব্য সাক্ষীর মধ্যে ৯৪ জনের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছিল বলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আসাম সরকার জানিয়েছিল। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত ছিল। জুবিনের মৃত্যুর সময় ইয়টে উপস্থিত থাকা পারিক্ষিত শর্মাও আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়েও আদালতের নজর রয়েছে। একই সঙ্গে আসামিদের একজন সিদ্ধার্থ শর্মার বিচার আসামের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার আবেদনও সুপ্রিম কোর্টে গৃহীত হয়নি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া আসামেই এগিয়ে চলছে।

বিদায়ের দিনে মানুষের ঢল

জুবিনের মৃত্যুর খবর আসামে যে শোকের ঢেউ তুলেছিল, তাঁর শেষযাত্রাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মরদেহ দেশে ফেরার পর গুয়াহাটি ও আশপাশের এলাকায় হাজারো মানুষ তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে রাস্তায় নেমে আসেন। ২১ সেপ্টেম্বর সোনাপুরের কামারকুচিতে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষযাত্রায় ১৫ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।

কামারকুচির সেই স্থান পরে ‘জুবিন ক্ষেত্র’ নামে স্মৃতিসৌধ ও শ্রদ্ধাস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতেও সেখানে ভক্তদের ভিড় দেখা গেছে। ফুল, গামছা এবং নানা শ্রদ্ধার্ঘ্য নিয়ে মানুষ সেখানে হাজির হচ্ছেন। অনেকের কাছে এটি শুধু একজন শিল্পীর স্মৃতিসৌধ নয়; বরং তাঁদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতির জায়গা।

এবারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনের ‘জুবিন দিবস’ আয়োজন করা হয়েছে। প্রার্থনা, সংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে। তাঁর স্ত্রী গরিমা গার্গও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।

স্মৃতিতে গান, গানে জুবিন

জুবিন গার্গের পরিচয় শুধু একজন গায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সংগীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। অসমিয়া সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর এবং তাঁর গান বহু বছর ধরে আসামের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।

হিন্দি চলচ্চিত্রে ‘ইয়া আলি’ গানটি তাঁকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রোতার কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে। ‘কৃষ ৩’-এর ‘দিল তু বাতা’সহ আরও বেশ কিছু হিন্দি গান তাঁর কণ্ঠকে বৃহত্তর শ্রোতামহলে পৌঁছে দেয়।

বাংলা সংগীতেও তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। ঢালিউডের ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ ছবির ‘ঢাকার পোলা’ গানটি বাংলাদেশের দর্শক-শ্রোতাদের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে।

তাঁর সংগীতজীবনের ব্যাপ্তি ছিল আরও বড়। বিভিন্ন ভাষা ও উপভাষায় গান গেয়ে তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বৃহত্তর শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।

এক বছর পরও জুবিন সর্বত্র

জুবিনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আসামের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর গান গেয়ে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। কোথাও তাঁর ছবি দিয়ে দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছে, কোথাও স্মরণসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরাও তাঁর গান পরিবেশন করে স্মরণ করছে তাঁকে।

জুবিনের স্ত্রী গরিমা গার্গ জানিয়েছেন, পরিবার এখনো জানতে চায় ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে ঠিক কী ঘটেছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং পরিবার সেই প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে।

এই মুহূর্তে তাই জুবিন গার্গকে ঘিরে দুটি বিষয় পাশাপাশি চলছে। একদিকে তাঁর মৃত্যুকে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে যাওয়া হিসেবে দেখেছে সিঙ্গাপুরের করোনার তদন্ত। অন্যদিকে, আসামে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সাতজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার চলছে। এই মামলার চূড়ান্ত রায়ই নির্ধারণ করবে আসামের আদালতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর আইনি পরিণতি।

তবে আদালতের বাইরের বাস্তবতা অনেকটাই স্পষ্ট—এক বছর পেরিয়েও জুবিনের গান থামেনি। তাঁর কণ্ঠ ফিরে আসছে স্মরণসভায়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে। একজন শিল্পীর মৃত্যুর পর তাঁর জনপ্রিয়তা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, জুবিন গার্গকে ঘিরে আসামের এক বছরের স্মরণ তারই একটি বড় উদাহরণ হয়ে আছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।