,

১৪ কোটি টাকার সড়কে ঢালাইয়ের পরই ফাটল

দীর্ঘদিনের খানাখন্দ আর ভাঙাচোরা পথ পেরিয়ে একটি টেকসই সড়কের অপেক্ষায় ছিলেন রাজশাহীর পবা ও তানোর উপজেলার মানুষ। সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়েছে সড়ক পুনর্বাসনের কাজ। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। সড়কের আরসিসি ঢালাই দেওয়া অংশে বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে, কোথাও আবার ঢালাই বসে গেছে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাঁদের অভিযোগ, ঢালাইয়ের আগে সড়কের নিচের মাটি যথাযথভাবে শক্ত করা হয়নি। কোথাও অপরিষ্কার ও দুর্বল জায়গার ওপরই কাজ করা হয়েছে। রোলার দিয়ে মাটি কমপ্যাক্ট করার কাজও ঠিকভাবে হয়নি বলে দাবি তাঁদের। পাশাপাশি ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম, বালুর পরিমাণ বেশি এবং খোয়া ও রড ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী। তাঁর বক্তব্য, নির্মাণসামগ্রীর মানে কোনো সমস্যা নেই। মূল সমস্যা সড়কের নিচের মাটিতে। তাঁর দাবি, ওই এলাকায় ‘অর্গানিক সয়েল’ থাকায় পানি পেলে মাটির ভার বহনের সক্ষমতা কমে যায়। ফলে ওপরের কাঠামোর চাপ নিতে না পেরে মাটি বসে যেতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং ঢালাই করা অংশে ভারী যানবাহন চলাচলও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি জানান।

৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসন

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ‘বায়া-কাশিম বাজার-তানোর সড়ক পুনর্বাসন কাজ (প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ)’ প্রকল্পের আওতায় ৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন কাজটি শুরু হয়েছে গত ৯ মে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ১২ মার্চ।

সড়কটি প্রশস্ত ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রকল্পের নির্দিষ্ট অংশে আরসিসি ঢালাই দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে পবা উপজেলার বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটার অংশে ঢালাই দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ওই ঢালাইয়ের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেয়। কয়েকটি জায়গায় সড়ক বসে যাওয়ার চিহ্নও রয়েছে। ফাটল ধরা অংশে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে প্রকল্পের অন্যান্য অংশে নির্মাণকাজ চলছিল।

১৭ সেপ্টেম্বর সকালে বায়া থেকে তানোরের আগপর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। কোথাও নির্মাণসামগ্রী রাখা, কোথাও শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেছে। আর ফাটল ধরা অংশগুলোতে কাজ থেমে ছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিচের মাটি শক্ত হয়নি

বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. কুরবান আলী বলেন, সড়কের কিছু অংশে যথাযথভাবে পরিষ্কার না করেই ঢালাই দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নিচের মাটিও প্রয়োজন অনুযায়ী শক্ত করা হয়নি। ফাটল ধরা অংশ তুলে নিচের মাটি ভালোভাবে শক্ত করে নতুন করে ঢালাই দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ওই এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. নাজমুল হুদা মোল্লার অভিযোগ আরও বিস্তৃত। তাঁর দাবি, গর্ত খননের পর মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাক্ট করা হয়নি। রোলার ঠিকভাবে না চালানোর কারণে সড়কের এক পাশে বসে গেছে এবং অন্য পাশে ফাটল দেখা দিয়েছে।

কাজের উপকরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। নাজমুল হুদা মোল্লার ভাষ্য, ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম এবং বালুর পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে খোয়া তুলনামূলক কম দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।

স্থানীয় কৃষক মো. আব্দুস সালামও নির্মাণকাজ নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। মাঠে কাজ করার সময় তিনি সড়কের নির্মাণকাজ দেখেছেন উল্লেখ করে বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক যথাযথ মান বজায় রেখেই নির্মাণ করা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিলের ভাষ্য, কাজ শেষ হওয়ার পরপরই কয়েকটি জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। এভাবে কাজ করা হলে সড়কটি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে।

মো. সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ইট ও রড ব্যবহারের কাজ যথাযথ হয়নি। নির্মাণ শেষ হওয়ার এক মাস না যেতেই ফাটল দেখা দেওয়ায় তিনি কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

কম্প্যাকশন ও ভাইব্রেশন নিয়েও প্রশ্ন

বাকসাড়া-নওদাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান জানান, নির্মাণকাজের সময় তিনি একজন প্রকৌশলীর কাছে নিচের মাটি শক্ত করার বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, মাটি যথেষ্ট শক্ত করা হয়নি। ঢালাই দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় কম্প্যাকশন বা ভাইব্রেশনের জন্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

প্রকৌশলগত দিক থেকে সড়কের ওপরের স্তরের স্থায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করে নিচের স্তরের প্রস্তুতির ওপর। মাটি দুর্বল থাকলে ওপরের কাঠামোর ভার সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন হতে পারে। পানি জমে মাটির ধারণক্ষমতা কমে গেলে কিংবা অতিরিক্ত ভার পড়লে বসে যাওয়া বা ফাটলের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগের কোনটি বাস্তবে ঘটেছে, তা নিশ্চিত করতে প্রকৌশলগত পরীক্ষা ও নির্মাণ-নথি যাচাই প্রয়োজন।

প্রকৌশলীর ব্যাখ্যা, সমস্যা মাটিতে

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মানে সমস্যা নেই। তাঁর ব্যাখ্যা, সড়কের নিচে ‘অর্গানিক সয়েল’ থাকায় পানি পেলে মাটির বেয়ারিং ক্যাপাসিটি বা ভার বহনের সক্ষমতা কমে যায়। ফলে ওপরের কাঠামোর চাপ নিতে না পেরে মাটি বসে যেতে পারে।

অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং ভারী যানবাহনের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলেও জানান তিনি।

মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় প্রকল্পের নকশা সংশোধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। মাটির বেয়ারিং ক্যাপাসিটি, বৃষ্টির পানি ও ভারী যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়কের কাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩ ইঞ্চি সিসি ঢালাইয়ের পাশাপাশি ১২ ইঞ্চি আরসিসি করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে দুই স্তরের রডের জালি এবং কর্নার বার বা কর্নার রড দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিষয়টি অবগত আছেন এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে গেছেন বলেও জানান তিনি।

তাঁর দাবি, কাজ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঠিকাদারের দাবি, ভারী যানবাহনেও ক্ষতি হতে পারে

নির্মাণকাজের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুয়েল ইলেকট্রনিক্সের ঠিকাদার মো. ইউনুস আলীও নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ঢালাই দেওয়ার পর অন্তত ২৮ দিন ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ঢালাইয়ের ওপর দিয়েই ভারী যানবাহন চলাচল করেছে। এতে নতুন ঢালাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।

ইউনুস আলী আরও বলেন, ওই এলাকার মাটি ভালো নয়। এ কারণে এমন পরিস্থিতিতে কাজ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আপত্তি জানানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, সেই আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি।

ফলে একই সমস্যাকে ঘিরে তিন পক্ষের তিন ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের আগে মাটি যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়নি এবং উপকরণ ও ঢালাইয়ের কাজেও ত্রুটি রয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্য, মূল সমস্যা দুর্বল ‘অর্গানিক সয়েল’, বৃষ্টি ও ভারী যানবাহনের চাপ। আর ঠিকাদারের দাবি, ঢালাইয়ের পর নির্ধারিত সময় ভারী যানবাহন বন্ধ না থাকায় ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।

এখন মূল প্রশ্ন নির্মাণমান নিয়ে

প্রায় ১৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে ফাটল ও দেবে যাওয়া অংশের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সড়কটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে মেরামত করা হবে এবং সংশোধিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণে কী পরিবর্তন আনা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

নির্মাণকাজে মাটির গুণগত মান, স্তরভিত্তিক কম্প্যাকশন, ঢালাইয়ের পুরুত্ব, রড ও অন্যান্য উপকরণের ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি বিষয়ই সড়কের স্থায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ফাটলের কারণ নিয়ে শুধু পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বদলে প্রকৌশলগত যাচাই ও নির্মাণের মান পরীক্ষা করাই স্থানীয়দের উদ্বেগের নিরসন করতে পারে।

পবা ও তানোরের মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের পর যে সড়কের জন্য এত বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেটি যেন কাজ শেষ হওয়ার পর আবার দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন না হয়। প্রায় ১৪ কোটি টাকার এই বিনিয়োগের লক্ষ্য হওয়া উচিত দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যবহার উপযোগী একটি সড়ক নিশ্চিত করা—এটাই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।