সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান চলার মধ্যে তিনি বিদেশে চলে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান। তিনি দেশ ছেড়ে গেলে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কমিশন। সেই কারণেই তাঁর বিদেশযাত্রা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা নয়। দুদক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করবে; এরপর আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচিত হবে। অর্থাৎ আবেদন করা এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার বিষয় দুটি পৃথক ধাপ।
অর্থপাচার থেকে নিয়োগ-পদায়ন, নানা অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার, সরকারি পদে নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব অভিযোগের সমর্থনে কী ধরনের তথ্য ও নথি রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে অভিযোগগুলোর কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার। দুদকের কাছে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বিপুল এই অর্থ দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। পর্তুগালেও জমি কেনার অভিযোগের কথা এসেছে। অভিযোগে বিদেশে সম্পদ কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।
তবে এসব তথ্যকে এখনো প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখছে না দুদক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ব্যাংক হিসাব ও বিদেশি সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে
অভিযোগের আর্থিক দিক যাচাইয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে দুদক। আসিফ মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব, দেশ-বিদেশের আর্থিক লেনদেন, সম্পদ ও বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন।
দুদকের চিঠিতে দেশে থাকা ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি বিদেশে সম্পদ অর্জন ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত তথ্যও চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে সম্পদ কেনা এবং অর্থপাচারের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দুদক জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে অভিযোগে উল্লেখ করা বিদেশি দেশগুলোর কাছ থেকেও তথ্য চাওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোর আওতায় মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট বা এমএলআর ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে বিদেশি কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চাওয়ার আগে অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক তথ্য ও ভিত্তি পাওয়া প্রয়োজন বলে দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ
আসিফ মাহমুদ সরকারি দায়িত্বে থাকার সময় নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে। বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট অভিযোগও অনুসন্ধানের অংশ। গত ২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পরে আরও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেলে সেগুলোও চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার কথা জানানো হয়।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত নথি চেয়েছিল দুদক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এসব নথি কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের প্রতিবাদ
দুদকের অভিযোগ ও বক্তব্যের বিষয়ে আসিফ মাহমুদ প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করেন। পরে তাঁর পক্ষে একজন আইনজীবী দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে আইনি নোটিশ পাঠান বলে সংবাদে এসেছে।
১১ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, তদন্তের চূড়ান্ত ফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই দুদকের বক্তব্যের কারণে তাঁকে নিয়ে জনপরিসরে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তাঁর দাবি, এতে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব অবস্থান হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে
বর্তমানে দুদকের কার্যক্রম মূলত অভিযোগের সত্যতা যাচাই, আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনাকে ঘিরে এগোচ্ছে। একদিকে আসিফ মাহমুদের দেশ-বিদেশের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের নথিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদনও এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। দুদকের আশঙ্কা, তিনি বিদেশে চলে গেলে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমে সমস্যা হতে পারে। সেই আশঙ্কার ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো অনুসন্ধানাধীন। ১১ হাজার কোটি টাকা অর্থপাচার থেকে শুরু করে নিয়োগ, পদায়ন, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম—কোনো অভিযোগই এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে দুদক জানায়নি। অনুসন্ধান শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।









