ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে মার্কিন র্যাপার ম্যাকলমোরকে এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। শিরানের সফরে অংশ নেওয়া একাধিক সহশিল্পীও একে একে ট্যুর থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক ফিনিয়াস, আইরিশ গায়ক-গীতিকার অ্যারন রো এবং ডেনিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহাম। শিরানের সঙ্গে লাইভ পারফর্ম করা আইরিশ লোকসংগীতের ব্যান্ড বিওগাও সফর থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেছে।
ঘটনাটি নিয়ে সংগীতাঙ্গনে আলোচনা শুরু হয় ৪ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এড শিরানের কনসার্টে ম্যাকলমোরের পারফরম্যান্সের পর। মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে তিনি দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’। এরপর তিনি পরিবেশন করেন ‘হিন্দ’স হল’ গানটি। ২০২৪ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গানটি প্রকাশ করেছিলেন ম্যাকলমোর।
গানটির পরিবেশনায় গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করা হয়েছে। পারফরম্যান্সের সময় বড় পর্দায় গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যও দেখানো হয়। পরদিন একই ভেন্যুতে আবার পারফর্ম করেন ম্যাকলমোর। দ্বিতীয় দিনের পরিবেশনার সময় নিজের অবস্থান নিয়ে আরও ব্যাখ্যা দেন তিনি।
ম্যাকলমোর বলেন, ইসরায়েল সরকারের সমালোচনা করা কিংবা বর্ণবৈষম্য ও গণহত্যার বিরোধিতা করা ইহুদি জনগোষ্ঠীর সমালোচনার সমান নয়। একই সঙ্গে গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষ যেন মনে না করেন যে তাঁদের কথা বিশ্ব ভুলে গেছে, সে কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এরপর তাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলি-আমেরিকান কাউন্সিল ম্যাকলমোরকে শিরানের সফর থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে আবেদন শুরু করে। ‘স্টপঅ্যান্টিসেমিটিজম’ নামের একটি সংগঠনও তাঁর পারফরম্যান্সের সমালোচনা করে। সংগঠনটির একটি পোস্ট পপ তারকা পিঙ্ক নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শেয়ার করেন। পরে পিঙ্ক পরিষ্কার করে জানান, ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তিনি করেননি। ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগানের বিরোধিতাও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না; বরং কনসার্টে উপস্থিত ইহুদি দর্শকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল।
বাদ পড়লেন ম্যাকলমোর
বিতর্কের কয়েক দিন পর গত সোমবার ম্যাকলমোর জানান, তাঁকে শিরানের সফরের বাকি কনসার্টগুলো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে ম্যাসাচুসেটসের জিলেট স্টেডিয়াম এবং এর মালিক রবার্ট ক্রাফটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ক্রাফট নিজেও তাঁর স্টেডিয়ামে ম্যাকলমোরের পারফর্ম না করার সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য, স্টেডিয়ামকে ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে চান না তিনি। ম্যাকলমোরের অতীতের কিছু বক্তব্য ও উপস্থাপনাকে ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য আঘাতমূলক বলেও উল্লেখ করেন ক্রাফট।
ক্রাফট আরও বলেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। তবে তাঁর দাবি, হামাসের কর্মকাণ্ড বাদ দিয়ে সংঘাতের নির্বাচিত কিছু দিক তুলে ধরলে তা সমাজে বিভাজন ও বিদ্বেষ আরও বাড়াতে পারে। যদিও অন্য ভেন্যুগুলোকে ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে, সফরের প্রোমোটার মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ জানায়, কয়েকটি ভেন্যু ম্যাকলমোরকে মঞ্চে পারফর্ম করতে দিতে আপত্তি জানিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সফরের বাকি অংশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এতে কয়েক লাখ দর্শক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারতেন বলে প্রোমোটারের পক্ষ থেকে বলা হয়।
শিরানের ব্যাখ্যা
ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার পর এড শিরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি তাঁর একার ছিল না। কয়েকটি ভেন্যু আপত্তি জানানোর পর পরিস্থিতির সমাধান করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেন্যুগুলো এবং সফরের প্রোমোটার মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিই বহাল থাকে।
শিরানের বক্তব্য অনুযায়ী, ম্যাকলমোরের সঙ্গে চুক্তিটি তাঁর ব্যক্তিগত চুক্তি ছিল না; সেটি ছিল সফরের প্রোমোটারের সঙ্গে। একই সঙ্গে আগে থেকেই কনসার্টের পরিকল্পনা করা দর্শকদের হতাশ করতে চাননি তিনি। সফরের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, সংগীতশিল্পী ও অন্যান্য সহশিল্পীদের কাজ এবং জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়েছে বলে জানান শিরান।
তবে তাঁর এই ব্যাখ্যার পরই সফরের অন্য শিল্পীদের একাংশ সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
সহশিল্পীদের প্রতিবাদ
বিলি আইলিশের ভাই এবং দীর্ঘদিনের সংগীত সহযোগী ফিনিয়াস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার কারণে শিল্পীদের চুপ করিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
ডেনিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহামও একই বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানায়। ব্যান্ডটির বক্তব্য, যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং শিশুদের নিরাপদভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার নিয়ে কথা বলার স্বাধীনতা শিল্পীদের থাকা উচিত। অর্থ কিংবা ক্ষমতার ভিত্তিতে কে কথা বলতে পারবেন এবং কোন মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলা যাবে, তা নির্ধারণ করা উচিত নয় বলেও তারা মন্তব্য করে।
আইরিশ গায়ক-গীতিকার অ্যারন রো জানান, শিরান তাঁর বন্ধু এবং তাঁর ক্যারিয়ারে শিরানের অবদান রয়েছে। ফলে সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
শিরানের সঙ্গে সরাসরি লাইভ পারফর্ম করা আইরিশ লোকসংগীতের ব্যান্ড বিওগাও সফর থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে।
ম্যাকলমোর-শিরানের ভিন্ন অবস্থান
ম্যাকলমোর নিজের বক্তব্যে শিরানের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে শিরানকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, তা তিনি বুঝতে পারেন। তবে কোনো রাজনৈতিক বা মানবিক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রেও মূল্য দিতে হয়। অর্থ, ব্র্যান্ড চুক্তি, স্পনসরশিপ, উৎসব, ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান, সম্পর্ক কিংবা পেশাগত সুযোগ হারানোর ঝুঁকি থাকে বলে উল্লেখ করেন তিনি। নিজের ক্ষেত্রেও এসব ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানান ম্যাকলমোর।
অন্যদিকে শিরান বলেছেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং উভয় পক্ষের মানুষের দুর্ভোগ তাঁকে বিচলিত করে। তবে নিজের পেশাগত মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর কনসার্টে বিভিন্ন বয়স ও পটভূমির মানুষ উপস্থিত থাকেন, যাদের মধ্যে শিশুও থাকে। তাই কনসার্টকে রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চে পরিণত করতে চান না তিনি।
শিরান একই সঙ্গে ম্যাকলমোরের নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানোর দৃঢ়তাকে সম্মান করার কথাও জানিয়েছেন। তাঁর মতে, একই উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর পথ সবার জন্য এক হতে হবে এমন নয়। তিনি প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে আলোচনা ও সংলাপের পথ বেছে নিয়েছেন।
ম্যাকলমোরকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক তাই এখন শুধু একজন শিল্পীর পারফরম্যান্স বাতিলের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। শিল্পীদের রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থান প্রকাশের স্বাধীনতা, কনসার্টের মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমা, দর্শকদের অভিজ্ঞতা এবং বাণিজ্যিক আয়োজনের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সম্পর্ক—সবকিছুই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।









