ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পরিত্যক্ত একটি টিনশেড ঘরে জুয়া খেলার ঘটনায় পলাতক পিবিআই কনস্টেবল মো. শহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার তাকে গ্রেফতারের পর এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া পুলিশ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে।
একই সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া সব পুলিশ সদস্যকে পুলিশের শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেন।
বুধবার দুপুর ১টার দিকে নিজের কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, ফৌজদারি অপরাধে কোনো পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হলে বা আদালতে আত্মসমর্পণ করলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গ্রেফতার পাঁচ সদস্যের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার জানান, তাদের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি মামলার তদন্তের পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। এ জন্য পৃথক বিভাগীয় মামলা গঠন করে একজন আলাদা তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে আদালতে চলমান মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত বিভাগীয় কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা সম্ভব হবে না।
ঘটনাটি তদন্তে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামতও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থল থেকে চারটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মোটরসাইকেলের কোনো রেজিস্ট্রেশন ছিল না। এ ছাড়া একাধিক মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে। ফোনগুলো কার এবং সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হতো, তা তদন্ত কর্মকর্তা যাচাই করছেন।
জব্দ করা এসব আলামত বর্তমানে ফৌজদারি মামলার তদন্তের অংশ। আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তদন্ত কর্মকর্তার এখতিয়ার বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। তদন্তের প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অভিযান চালানোর সময় সহকর্মীদের ধাক্কাধাক্কিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জুয়েল রানা আহত হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তাঁর ডান হাতের একটি আঙুলের হাড় ভেঙে গেছে। পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন জানান, আঙুলের এই ধরনের আঘাত বেশ যন্ত্রণাদায়ক হওয়ায় চিকিৎসক তাকে মেডিকেল রেস্টে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
হাতে ব্যান্ডেজ থাকায় জুয়েল রানা আপাতত দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এ কারণে তাকে ছুটি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।
নিজ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগতভাবে কঠিন হলেও দায়িত্ব পালনে এর কোনো বিকল্প দেখছেন না পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, অধীনস্থ প্রতিটি কর্মকর্তা ও সদস্যকে তিনি নিজের সন্তানের মতো মনে করেন। গ্রেফতার হওয়া সদস্যদের পরিবারের স্বজনেরা যখন কান্নাকাটি করে তার কাছে আসেন, তখন বিষয়টি তার জন্যও কষ্টের হয়ে ওঠে।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, পুলিশ সদস্য হওয়ার কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেয়; বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধ করলেও একই নীতি অনুসরণ করতে হবে। পেশাগত দায়িত্বের জায়গা থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই তার প্রধান কর্তব্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা নিয়ম মেনে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলে বিষয়টি হয়তো শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত। কিন্তু অভিযানে বাধা দেওয়া এবং একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আহত করার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুতর রূপ নেয়। সে কারণে নিরপেক্ষভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াকে তিনি প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।
এদিকে পলাতক থাকা শহিদুল ইসলামের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে মামলায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের সবাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে এসেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার তদন্ত এবং পুলিশের নিজস্ব বিভাগীয় প্রক্রিয়া—দুই দিকেই ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মামলার তদন্তে জব্দ করা মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য আলামত কী তথ্য দেয়, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।









