লক্ষ্মীপুরে চাঁদা না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীকে মারধরের পর তাঁর শরীরে ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে তিনজনের বিরুদ্ধে। এ সময় বাধা দিতে গিয়ে আরও দুই ব্যবসায়ীসহ তিনজন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। তবে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী-সংলগ্ন কালীবাজার সড়কে ঘটনাটি ঘটে। আহতদের মধ্যে ব্যবসায়ী কৃষ্ণপাল, শাহেদ আলম, সোহাগ ও রাকিবের বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেলেও পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় তিনজন আহত হয়েছেন এবং তাঁদের লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
মামলায় অভিযুক্ত তিনজন হলেন দেলোয়ার হোসেন, তাঁর ছোট ভাই শাকিল ও মুন্না। দেলোয়ার ওই এলাকার মৃত ধনু মিয়ার ছেলে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেলোয়ার এর আগেও কালীবাজার এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন। সেলুন ব্যবসায়ী জগদীশের কাছে প্রতিদিন ৫০০ টাকা এবং মোবাইল সার্ভিস ব্যবসায়ী কৃষ্ণপালের কাছেও একই পরিমাণ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মঙ্গলবার দুপুরে দেলোয়ার, শাকিল ও মুন্না কৃষ্ণপালের দোকানে যান। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে দোকানে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাশের দোকানের ব্যবসায়ী শাহেদ আলম ও কর্মচারী সোহাগ ঘটনাটি ঠেকাতে এগিয়ে এলে তাঁদেরও মারধর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় একজন ব্যবসায়ীর শরীরেও পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আশপাশের ব্যবসায়ীরা তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার পর স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতদের পরে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনা ও উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকানে ঢুকে চাঁদা দাবি, মারধর এবং পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার মতো ঘটনা তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কালীবাজারের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বাজার এলাকায় ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। লক্ষ্মীপুর বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাজারে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। ঘটনার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শরিফুর রহমান জানান, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং মামলার কপি আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।
তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি দুই সহযোগীকে নিয়ে দোকানে প্রবেশ করে চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না পেয়ে দোকানে পেট্রল ছিটানো এবং সেখানে থাকা একজনের মাথায় পেট্রল ঢেলে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানুষের জীবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়, সে জন্য সবাইকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চাঁদা দাবি ও তা নিয়ে বিরোধের জেরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা কিংবা অগ্নিসংযোগের চেষ্টা শুধু ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, আশপাশের দোকান ও সাধারণ মানুষের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। কালীবাজারের ব্যবসায়ীদের বর্তমান উদ্বেগের মূল জায়গা তাই শুধু মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার নয়; বাজারে স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোও জরুরি।









