কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলার অভিযোগে করা মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ায় সাধারণ কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গ্রেফতার ও হয়রানির আতঙ্ক।
ঘটনার পর কয়েকজন কৃষক দাবি করেছেন, তারা সরাসরি হামলার সঙ্গে জড়িত না থাকলেও মামলায় অজ্ঞাত আসামি থাকায় আতঙ্কে রয়েছেন। কেউ কেউ রাতে বাড়িতে না থেকে অন্যত্র অবস্থান করছেন বলেও জানিয়েছেন।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের ভূরুঙ্গামারী-সোনাহাট স্থলবন্দর সড়কের শহীদ মোড় এলাকায় এক ডিলারের গুদামের সামনে সারের দাবিতে কয়েকশ কৃষক জড়ো হন। কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছিল না। একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কিছু মানুষকে বেশি পরিমাণে সার দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
সার না পেয়ে একপর্যায়ে কৃষকেরা সড়কে বাঁশ ফেলে এবং আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ শুরু করেন। খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় সেখানে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে (বিএস) অবরুদ্ধ করে হামলা করার অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে কৃষি কর্মকর্তা ও বিএসকে নিরাপত্তার জন্য একটি বাড়ির ভেতরে আশ্রয় নিতে হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন।
ঘটনার পর কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বাদী হয়ে ভূরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিম উদ্দিন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সরকারি কাজে বাধা এবং কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে। এ মামলায় দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, সারের সংকট ও বিতরণব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ থেকেই মূলত ওই দিনের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। ঘটনাস্থলে থাকা কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, সেদিন প্রায় ছয় থেকে সাতশ মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কৃষকদের জানানো হয়েছিল, প্রত্যেকে ১০ কেজি করে সার পাবেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসে খুচরা পর্যায়ে সার দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং দুইজন মিলে এক বস্তা সার পাওয়ার কথা জানান।
মোজাম্মেল হকের দাবি, সাধারণ কৃষকেরা কয়েকবার গিয়েও সার না পেলেও পরে কিছু অপেক্ষাকৃত সচ্ছল কৃষক টাকা দিয়ে একেকজন পাঁচ থেকে সাত বস্তা পর্যন্ত সার পেয়েছেন। এতে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ঘটনার পর মামলা হওয়ায় এখন অনেক কৃষক বাড়িতে রাত কাটাতে ভয় পাচ্ছেন। পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে কেউ কেউ রাতে অন্য জায়গায় থাকছেন এবং দিনের বেলায় মাঠে কাজ করতে ফিরে আসছেন।
গুনাইয়েরকুটি গ্রামের এক কৃষকও একই ধরনের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, দুইজনকে গ্রেফতারের পর এলাকায় রাতে পুলিশের আনাগোনা বেড়েছে। দিনভর মাঠে কাজ করার পরও রাতে নিজের বাড়িতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছেন না তিনি। ফলে বিভিন্ন জায়গায় রাত কাটিয়ে সকালে আবার কাজে ফিরছেন।
আরেক কৃষক রমজান আলী জানান, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং কৃষি কর্মকর্তা ও বিএসকে নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর দাবি, যারা হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে অজ্ঞাত আসামির তালিকায় নিরপরাধ কৃষকেরা জড়িয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
এদিকে কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার মামলার বাদী হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পুলিশ অবশ্য কৃষকদের অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ওসি আজিম উদ্দিন বলেছেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত করা হবে। নিরপরাধ কাউকে গ্রেফতার করার সুযোগ নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
ভূরুঙ্গামারীতে সারের সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক জায়গায় কৃষকদের অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে। ৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনাতেও মূল বিরোধের কেন্দ্রে ছিল চাহিদার তুলনায় সার পাওয়া এবং বিতরণে স্বচ্ছতা নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি প্রকৃত অভিযোগগুলো যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে উত্তেজনা কমানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সারের মতো কৃষি উপকরণের সরবরাহে সামান্য অনিয়মের অভিযোগও কৃষকদের মধ্যে দ্রুত অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। কারণ চাষের মৌসুমে সময়মতো সার না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভূরুঙ্গামারীর ঘটনায় সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত সড়ক অবরোধ, কর্মকর্তাকে ঘিরে উত্তেজনা এবং মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। এখন কৃষকদের প্রত্যাশা, প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।









