ভারতীয় সংগীতশিল্পী আকাসা সিং মনে করেন, একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার জায়গা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের কণ্ঠ, অনুভূতি ও সৃজনশীলতার ওপর আস্থা রেখে তিনি জানিয়েছেন, যতদিন নিজে গান গাওয়ার সক্ষমতা রাখবেন, ততদিন সংগীত তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন দেখেন না।
সম্প্রতি বেঙ্গালুরু সফরে সংগীতজগতের দ্রুত পরিবর্তন, লাইভ পারফরম্যান্স নিয়ে দর্শকের বাড়তে থাকা প্রত্যাশা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং সংগীতে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আকাসা। ‘জব তলক’ ও ‘পানওয়াড়ি’র মতো সাম্প্রতিক গানের সাফল্যের কারণে বর্তমানে ক্যারিয়ারের ভালো সময় পার করছেন এই শিল্পী। তবে তার মতে, এখনকার সংগীতশিল্পীদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু ভালো বা জনপ্রিয় গান তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মঞ্চে পারফরম্যান্স, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং দর্শকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আকাসার ভাষ্য অনুযায়ী, লাইভ পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে শ্রোতা-দর্শকের প্রত্যাশা আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে। শুধু মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার বাইরে এখন শিল্পীদের কাছ থেকে আরও প্রাণবন্ত ও দৃশ্যমান পরিবেশনা আশা করা হয়। মঞ্চসজ্জা, আলো, শরীরী ভাষা কিংবা সামগ্রিক উপস্থাপনার দিকেও দর্শকের নজর থাকে। তবে আকাসা মনে করেন, এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক শিল্পীকেই নাচতে হবে কিংবা একই ধরনের মঞ্চ পরিবেশনা অনুসরণ করতে হবে।
মঞ্চে নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে সুনিধি চৌহানকে আদর্শ মনে করেন আকাসা। পাশাপাশি শ্রেয়া ঘোষালের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নাচের ওপর নির্ভর না করেও একজন শিল্পী নিজের কণ্ঠ, গায়কী ও মঞ্চ উপস্থিতির মাধ্যমে দর্শককে মুগ্ধ করতে পারেন। অর্থাৎ, পারফরম্যান্সের ধরন শিল্পীভেদে আলাদা হতে পারে এবং নিজের শক্তির জায়গাকে কাজে লাগিয়েই মঞ্চে আলাদা পরিচয় তৈরি করা সম্ভব।
লাইভ শোর মান ও আয়োজনের পরিধি বাড়ার বিষয়টিকে অবশ্য ইতিবাচকভাবে দেখছেন আকাসা। তার মতে, ভারতীয় শিল্পীদের আন্তর্জাতিক মানের মঞ্চ পরিবেশনা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিশ্বের বড় শিল্পীদের মতো ভারতীয় শিল্পীরাও সংগীতের পাশাপাশি বড় পরিসরের মঞ্চ আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারেন। তবে এ ধরনের আয়োজনের পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পীদের নিজেদের অর্থও বিনিয়োগ করতে হয় বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গেও আকাসার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, গত কয়েক বছরে এই মাধ্যম সংগীতশিল্পীদের জন্য নতুন ধরনের সুযোগ তৈরি করেছে। আগে শিল্পীদের পরিচিতি ও শ্রোতা তৈরির ক্ষেত্রে সংগীত পরিচালক, রেকর্ড লেবেল কিংবা রিয়েলিটি শোর ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হতো। এখন একজন শিল্পী নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সরাসরি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারেন এবং নিজের একটি অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেন।
তবে এই পরিবর্তনের একটি নেতিবাচক দিকও দেখছেন আকাসা। তার মতে, অনেক সময় একজন শিল্পীর সংগীত প্রতিভার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতজন অনুসারী রয়েছে, সেটিও গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। ফলে গায়ক বা গায়িকাদের অনেক সময় একই সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভূমিকাও পালন করতে হচ্ছে। একজন শিল্পীর মূল পরিচয় যেখানে সংগীত, সেখানে তাকে নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরিতে ব্যস্ত থাকতে হওয়াটা তার কাছে কিছুটা হতাশাজনক।
তরুণ শ্রোতাদের সংগীতের রুচির দ্রুত পরিবর্তনও শিল্পীদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে বলে মনে করেন তিনি। ক-পপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগীত এখন খুব সহজেই তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে শ্রোতারা কেবল গান শুনেই সন্তুষ্ট থাকছেন না; শিল্পীর পোশাক, মঞ্চসজ্জা, নাচ, ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা এবং পুরো পারফরম্যান্সের দিকে নজর দিচ্ছেন। বিশ্ব সংগীতের বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা হাতের নাগালে চলে আসায় শিল্পীদের প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই সংগীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংশয় প্রকাশ করেছেন আকাসা। তার আশঙ্কা, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার ভবিষ্যতে শুধু গায়ক-গায়িকাদের নয়, বাদ্যযন্ত্রী, গিটারিস্ট এবং লাইভ মিউজিশিয়ানদের কাজেও প্রভাব ফেলতে পারে। সংগীত তৈরির বিভিন্ন ধাপে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও মানুষের নিজস্ব দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার জায়গাটি যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই তার প্রধান উদ্বেগ।
প্রযুক্তিনির্ভর সংগীতের ক্ষেত্রে আকাসার এই অবস্থানের পেছনে তার অটো-টিউন নিয়ে অস্বস্তির অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সংগীতে অটো-টিউনের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ার সময়ও তিনি বিষয়টি স্বস্তির সঙ্গে নিতে পারেননি বলে জানান। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়েও তার সংশয় তৈরি হয়েছে।
আকাসার মতে, প্রযুক্তি মানুষের একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সহজ করতে পারে। কিন্তু মানুষের কণ্ঠ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতার জায়গা প্রযুক্তির হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। একজন শিল্পীর নিজস্ব কণ্ঠ ও স্বকীয়তাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই গান তৈরির ক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্য ও সৃজনশীলতার ওপর নির্ভর করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
সংগীতের পাশাপাশি বেঙ্গালুরুর সঙ্গে নিজের দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও জানিয়েছেন আকাসা। ২০১১ সাল থেকে নিয়মিত এই শহরে যাতায়াত করছেন তিনি। শহরের আবহাওয়া ও খাবার তার বিশেষ পছন্দের। তবে বেঙ্গালুরুর যানজট নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও শহরটিকে নিজের পছন্দের জায়গাগুলোর একটি হিসেবেই মনে করেন এই সংগীতশিল্পী।









