,

সময়মত সার পেলে ফসল আর কৃষক একসাথে হেসে ওঠে

সাব্বির আহমেদ

সরকার বলছে সারের সংকট নেই – পর্যাপ্ত মজুদ আছে। মাঠের চিত্র ভিন্ন। দিনের পর দিন ডিলারের দরজায় ঘুরে ঘুরে সরকারি দামে সার না পেয়ে কালোবাজার থেকে বস্তা প্রতি ৩০০ – ৪০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে কৃষককে। ঢাকা ট্রিবিউন জানিয়েছে, যারা কেজি দরে সার কেনেন তাদের সারের ভিন্নতা অনুযায়ী কেজি প্রতি ১১ থেকে ১৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারিতে ডিলারের গুদাম থেকে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে গিয়েছিল সে এলাকার কৃষকেরা। দেয়ালে পিঠ কতটা ঠেকলে কৃষক এমন কাজ করতে বাধ্য হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়।

সার সংকটের জন্য সরকার ডিলারদের উপর দায় চাপিয়ে বলছে, বরাদ্দকৃত সার ডিলাররা নিচ্ছে না। ডিলাররা বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় সরকার সার কম দিয়েছে। সিপিডির রিসার্স ফেলো ডেইলি স্টারকে বলেছেন, “সরকারের দেখানো চাহিদার অতিরিক্ত মজুদ এত কম যে বাজার তাতে সন্তস্ট হতে পারছে না, দুর্বল বাজার তদারকি ব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে ডিলারগণ”। তিনি আরও বলেন, “অনেক ডিলার একাধিক লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছেন, কেউ কেউ পুরো একটা জেলার সার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছেন – বাস্তবিক অর্থেই এই ডিলারগণ একচেটিয়া ব্যবসা সৃষ্টি করেছেন”।

চলমান সার সংকটের মূল কারণ আসলে চারটিঃ ১) গত বছরের তুলনায় সারের বেশি চাহিদা, ২) গ্যাস সংকট, ৩) ডিলার নীতি পরিবর্তন, এবং ৪) সময়ানুগ পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা। চলতি বছরে বন্যা না হওয়ায় এবং আবহাওয়া যথেষ্ট ভাল থাকায় অনেক বেশি জমি চাষাবাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বেশি জমিতে চাষাবাদ মানে বেশি পরিমাণ সারের প্রয়োজন। তাই বেড়েছে সারের চাহিদা।

চলমান গ্যাস সংকটের কারণে আশুগঞ্জ সারকারখানা ২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বন্ধ আছে। যমুনা সারকারখানা বন্ধ আছে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। তখন থেকেই দেশের মানুষ ধারণা করছিল যে এ বছর সার সংকট দেখা দেবে। হয়েছেও তাই। সার সংকট ডিলারদের সার নিয়ে নয়-ছয় করার সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানে বিসিআইসির সাতটি সারকারখানার মধ্যে তিনটি চলছে বটে তবে তা পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করেছে। ২০২৬-২৭ সালের জন্য দেশে রাসায়নিক সারের মোট চাহিদা ৫৮ লক্ষ টন। এর মধ্যে ৩৭ লক্ষ টন উৎপাদন সক্ষমতা বাংলাদেশের থাকলেও গ্যাসের অভাবে ২০২৫-২৬ সালে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১.০৬ টন যা মোট সক্ষমতার ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থ বছরে গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে, দেশীয় উৎপাদন যে আরও কম হবে তা চোখ বুজে বলে দেয়া যায়। ৭০ শতাংশের অধিক সার আমদানি করতে হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ইউরিয়া সার আমদানি করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার থেকে। এসব দেশের উপর ইরানের ব্যাপক বোমা হামলার কারণে এদের উৎপাদন ব্যহত হয়েছে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এই তিন দেশের কাছ থেকে ইউরিয়া আনা যাচ্ছে না। রাশিয়া এবং চীন ইউরিয়া সারের আরেক বৃহৎ রফতানিকারক। ইরান যুদ্ধ শুরু হবার পর তারা সার রফতানি বন্ধ করে রেখেছে। আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, ব্রুনেই, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া কম করে হলেও ইউরিয়া রফতানি করে। তাদের কাছ থেকে ইউরিয়া আনা সম্ভব। মিশর একটি বড় ইউরিয়া রফতানিকারক দেশ। ওয়ার্ল্ড ফার্টিলাইজার ম্যাগাজিনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে মিশর ২৫ শতাংশ বেশি সার উৎপাদন করেছে। মিশরের কাছ থেকে সার এনে দেশের ইউরিয়া ঘাটতি মেটানো যায়।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ টিএসপি, ড্যাপ এবং এমওপি আমদানি করে রাশিয়া, কানাডা, মরক্কো, চীন, তিউনিসিয়া, জর্ডান এবং মিশর থেকে। রাশিয়া ও চীন রফতানি বন্ধ করে রেখেছে। অন্যদের কাছ থেকে ইউরিয়া ব্যতীত অন্যান্য সার আনতে অসুবিধা নেই। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র, লিথুনিয়া এবং মেক্সিকো থেকেও টিএসপি, ড্যাপ এবং এমওপি সার আমদানি করা যায়। দরকার শুধু, সুষ্ঠু পরিকল্পনার এবং উদ্যেগের। সার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। টাকার কথা ভাবলে চলবে না।

চলমান সার সংকটের আরেক কারণ সার ডিলার নিয়োগ এবং সংরক্ষণ নীতি ২০২৫। নতুন এই নীতি অনুযায়ী, বিসিআইসি এবং বিএডিসি নিয়োগকৃত ডিলারগণ এখন একই পদ্ধতির অধীনে চলে এসেছে। নীতি পরিবর্তনের ফলে বহুদিন ধরে সার বিতরণের সঙ্গে জড়িত ডিলারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তাঁরা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার ও ডিলারশীপ হারানোর আশংকা করছেন। প্রতি ইউনিয়নে দুইজন করে নতুন ডিলার নিয়োগ করাকে পুরনো ডিলারগণ নিজেদের ব্যবসায় অন্যের ভাগ বসানো হিসেবে দেখছেন। তার উপর বিসিআইসি এবং বিএডিসি নিয়োগকৃত ডিলারদের মধ্যে আগে থেকেই একটা টেনশন কাজ করছিল। তাছাড়া ডিলারদের মধ্যে সার সমভাবে বণ্টন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে যা অনেকের ব্যবসায়ের তথা জীবকার উপর বড় প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, নতুন ডিলার নীতির প্রতি পুরনো ডিলারগণ বিরাগভাজন হয়ে আছেন।

ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকা এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করার ঠিক পরেই আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। তখন কৃষকসহ সকলকে মাইলের পর মাইল ১২/১৪ ঘণ্টা ধরে পেট্রোল পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে। তখনই বোঝা গিয়েছিল যে বিদ্যুৎ এবং সারের জন্যেও এমন হাহাকার অচিরেই দেখা দেবে। এ বিষয়ে মার্চ মাস থেকেই সামাজিক এবং গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। তখন উপযুক্ত পরিকল্পনা, বিশ্লেষণ, প্রাক্কলন – অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সহযোগে উদ্যোগ নিলে চলমান সার সংকট এড়ানো যেত; এখনকার তুলনায় কম খরচে গ্যাস, জ্বালানি তেল এবং সার আমদানি করা যেত।

বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে চলতি বছরে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবার এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিগত বোরো মৌসুমে কৃষক সরকারের কাছ থেকে ন্যয্য দাম পায়নি। গত বছরের দাম, ৩২.৯৬ টাকা থেকে মাত্র ১ পয়সা বাড়িয়ে এবার ৩২.৯৭ টাকায় চাল কিনেছে সরকার। অথচ সরকার নিজেই জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে, বিদ্যুতের অভাবে সেচ দেয়া যায়নি যথেষ্ট। তার উপর ছিল ৯ শতাংশের অধিক মূল্যস্ফীতি। দরিদ্রতর হয়েছে কৃষক। কষ্টে আছে কৃষক। তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে যদি এখন তাঁরা সময়মত সার না পান বা কালোবাজার থেকে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হয়।

দূরবর্তী দেশ হলেও, পরিবহণ খরচ বেশি হলেও, বিভিন্ন সার রফতানিকারক দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমদানি উৎস বাড়িয়ে সারের যোগান নিশ্চিত করা সম্ভব। ডিলারদের মধ্যে যার যার প্রাপ্য অনুযায়ী ন্যয্যতার ভিত্তিতে সার বণ্টন করে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটা ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা তৈরি করে ডিলারদের সার্বক্ষণিক তদারকির আওতায় এনে সার বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। নইলে, খাদ্য নিরাপত্তা বলে আর কিছু থাকবে না; অনেক বেশি দামে খাদ্য আমদানি করতে হবে; জুলাই মাসে জাতিসঙ্ঘের খাদ্য কর্মসূচির ঘোষণা করা আশংকাঃ “তীব্র খাদ্য ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশের এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ” – বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কলাবাগান, ঢাকা।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।