চীনের আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার মূলধন জোগানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। আর্থিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো, ঋণপ্রবাহ সচল রাখা এবং দুর্বল হয়ে পড়া মূলধন কাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই সমন্বিত এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
রোববার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান পৃথক ঘোষণায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই মূলধন সহায়তার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে দেশের বৃহত্তম জীবনবীমা প্রতিষ্ঠান চায়না লাইফ ইন্স্যুরেন্স গ্রুপ পাবে ৩৫ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। আর চায়না তাইপিং ইন্স্যুরেন্স গ্রুপকে দেওয়া হবে ৭ বিলিয়ন ইউয়ান।
এ ছাড়া পিপলস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অব চায়না সর্বোচ্চ ১৫ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহের পরিকল্পনা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি ব্যবস্থায় এ-শ্রেণির শেয়ার ইস্যু করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে তা বিক্রি করবে। সংগৃহীত অর্থ মূলধন বাড়াতে ব্যবহার করা হবে।
রাষ্ট্রীয় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই সহায়তা এমন এক সময়ে আসছে, যখন দীর্ঘদিনের নিম্ন সুদের হার তাদের মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি আকারের বেশ কিছু বীমা প্রতিষ্ঠানের পরিশোধ সক্ষমতার সূচকও দুর্বল হয়েছে। ফলে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন শক্তিশালী করা পুরো বীমা খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের মাধ্যমে সহায়তা করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। শক্তিশালী মূলধনভিত্তি থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বজায় রাখার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত ছোট ও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বীমা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নেও সহায়তা করতে পারবে।
চায়না এক্সপোর্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের মূলধন বাড়াতে ১০ বিলিয়ন ইউয়ান দেবে। অন্যদিকে চায়না রিইন্স্যুরেন্স গ্রুপ আরও ৩ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহ করবে। এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের মূলধন কাঠামো মজবুত করতে এবং ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হবে।
চায়না লাইফ জানিয়েছে, নতুন মূলধন বাস্তব অর্থনীতিতে আর্থিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ঝুঁকি সহনশীলতা শক্তিশালী করবে। চায়না তাইপিংয়ের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নতুন তহবিল তাদের পরিশোধ সক্ষমতা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচক উন্নত করতে সহায়ক হবে।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকেও বড় মূলধন সহায়তা
বীমা খাতের পাশাপাশি চীনের তিনটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের জন্যও মোট ২৯০ বিলিয়ন ইউয়ানের মূলধন পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে দেশটির বার্ষিক সংসদীয় বৈঠকে প্রথম এই পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। এর মাধ্যমে গত বছর কয়েকটি বড় রাষ্ট্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত একই ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।
চীনের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না সর্বোচ্চ ১৬০ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহ করবে। আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহের পরিকল্পনা জানিয়েছে। উভয় ব্যাংকই বেসরকারি এ-শেয়ার প্লেসমেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি চায়না ন্যাশনাল টোব্যাকো করপোরেশন ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো এই শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে অংশ নেবে।
ব্যাংক দুটি জানিয়েছে, নতুন অর্থ সম্পূর্ণভাবে মূলধনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর ‘কোর টিয়ার-১’ মূলধন বাড়াতে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা এবং অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রাখা সহজ হবে।
চীনের অর্থনীতিতে বর্তমানে দুর্বল ঋণচাহিদা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। ব্যবসা ও ভোক্তা পর্যায়ে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী নিম্ন সুদের হার ব্যাংক ও বীমা—দুই খাতের লাভজনকতাকেই সংকুচিত করেছে।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি মূলধন জোগানোর সিদ্ধান্তকে আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূলধনভিত্তি শক্তিশালী হলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি সামলে ঋণ সম্প্রসারণ চালিয়ে যেতে পারবে, আর বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম থাকবে।
চীনা সরকারের জন্য বিষয়টি শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ঋণ সরবরাহ এবং বড় বীমা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নতুন মূলধন জোগানের এই উদ্যোগ আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করার একটি প্রচেষ্টাও।










