দেশে একই সময়ে ডেঙ্গু, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চিকুনগুনিয়া, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি)সহ বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় জ্বরের রোগী বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিনই জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীরব্যথা, র্যাশ, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে রোগীরা আসছেন। কারও কারও শরীরে একাধিক ভাইরাসের সংক্রমণও শনাক্ত হচ্ছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে জ্বরকে শুধু সাধারণ মৌসুমি উপসর্গ হিসেবে দেখলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ একই ধরনের জ্বরের পেছনে থাকতে পারে ভিন্ন ভিন্ন ভাইরাস। আবার উপসর্গের মধ্যেও অনেক মিল থাকায় শুধু রোগীর শারীরিক লক্ষণ দেখে সব সময় নিশ্চিতভাবে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের জন্য একাধিক পরীক্ষা করাতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। এতে চিকিৎসার খরচ বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের। পাশাপাশি পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত জ্বরের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হওয়ায় চিকিৎসকদের জন্যও সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হচ্ছে না।
শিশু হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর ভিড়
রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে শনিবার সকালে দেখা যায়, বহির্বিভাগের সামনে রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘ সারি। সকাল থেকেই পাঁচটি কাউন্টারে চিকিৎসকেরা শিশুদের দেখছিলেন। কারও কোলে জ্বরে কাতর শিশু, কোনো শিশুর শ্বাসকষ্ট, আবার কেউ এসেছে ডায়রিয়া নিয়ে। অনেকের জ্বরের সঙ্গে শরীরে র্যাশ দেখা দিয়েছে। কারও রয়েছে তীব্র শরীরব্যথা, সর্দি ও কাশি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, এক মাস আগেও প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মেডিসিন বহির্বিভাগে গড়ে ২৫০ থেকে ২৭০ রোগী আসত। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫০ থেকে ৪৬০-এ। জরুরি বিভাগসহ দুটি বিভাগে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। ভর্তি রোগীদের বড় অংশের বয়স শূন্য থেকে পাঁচ বছর।
হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসক এবিএম মাহফুজ হাসান আল মামুন বলেন, বেশির ভাগ শিশু জ্বর, শরীরে র্যাশ ও ডায়রিয়া নিয়ে আসছে। অনেকের ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও উপসর্গ ডেঙ্গুর মতো থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক পরীক্ষা করতে হচ্ছে। তাঁর হিসাবে, প্রায় ৫ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।
টঙ্গী থেকে ১৮ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন হুমায়রা ইসলাম। তাঁর সন্তানের এক সপ্তাহ ধরে জ্বর। বিভিন্ন পরীক্ষা করিয়েও জ্বরের কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। চিকিৎসকেরা শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু শয্যা না থাকায় তাঁকে অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আগারগাঁও থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন নাহিদা আক্তার। ছোট মেয়ের জ্বর সেরেছে তিন দিন আগে। এর মধ্যেই জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে বড় মেয়ে। ডেঙ্গু কিংবা হাম হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
একই জ্বরের পেছনে ভিন্ন রোগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ডেঙ্গু যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। হাম মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও উভয় রোগই শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুতেও শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে হামের ক্ষেত্রে সাধারণত জ্বর হওয়ার পর র্যাশ শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে তা শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে চোখ, মেরুদণ্ডসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে তীব্র ব্যথা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। মৌসুমি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণত এ ধরনের তীব্র শরীরব্যথা দেখা যায় না।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ ও শকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। হামের বড় জটিলতাগুলোর একটি নিউমোনিয়া। আর ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও নাক বন্ধ থাকার প্রবণতা বেশি।
ফলে শুধু জ্বর হয়েছে বলেই একে একটি নির্দিষ্ট রোগের লক্ষণ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। রোগীর বয়স, উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল মিলিয়ে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
ডেঙ্গুতে ডেন-২ ও ডেন-৩ শনাক্ত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডে প্রতিদিনই নতুন রোগী ও মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হচ্ছে। আগস্টের মাঝামাঝি এক দিনে ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই দিন মারা যান তিনজন। তখন চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২৫ হাজার ৬০১ এবং মৃত্যু ৭৪।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানান, দেশের ১২টি সাইট থেকে সংগ্রহ করা নমুনা বিশ্লেষণ করে গ্রামাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গুর ডেন-২ ভাইরাসের প্রকোপ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ডেন-৩ এবং মিশ্র ডেঙ্গু সংক্রমণও শনাক্ত হচ্ছে।
তিনি জানান, এ বছর সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার তুলনায় আরএসভির প্রকোপও অস্বাভাবিক বেশি। ডেঙ্গুর ধরন নিয়ে গবেষণার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতিও চলছে।
জ্বর কমলেও থাকছে চিকুনগুনিয়ার ব্যথা
ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াতেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, অনেক রোগীর জ্বর কমে গেলেও শরীরের ব্যথা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থেকে যাচ্ছে।
চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের তীব্র জয়েন্ট ও শরীরব্যথা হতে পারে। এতে হাঁটা-চলায়ও সমস্যা দেখা দেয়। কোনো কোনো রোগীর চোখ-মুখ ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা যায়।
জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া কিংবা ইন্টারনেটের তথ্য দেখে চিকিৎসা শুরু না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে এলে চিকিৎসার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে যায়।
শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসেও বাড়ছে সংক্রমণ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, দেশে সাধারণত মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের পর সংক্রমণ কিছুটা কমলেও পরে আবার তা বেড়েছে।
তাঁর মতে, বর্তমানে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা এখন অন্যতম প্রধান কারণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ও টাইপ-বি—দুটিই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর শরীরে শনাক্ত হচ্ছে।
ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস দ্রুত ছড়াতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাই জ্বরের সঙ্গে সর্দি, কাশি, গলাব্যথা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
হামের সংক্রমণও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
এদিকে দেশে হামের সংক্রমণও অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শনিবারের বুলেটিন অনুযায়ী, ওই দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৬১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজন এবং হাম শনাক্ত হওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য প্রকাশ করছে। তাদের হিসাবে, এ পর্যন্ত হাম শনাক্ত হয়ে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৮৯১ জনের।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ৮৪৩ জন রোগী এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ৭৬১ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গ নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫। হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৬৪১ জনের শরীরে।
তবে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা প্রত্যেক রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। ফলে পরীক্ষায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দিয়ে দেশে হামের প্রকৃত বিস্তার কতটা, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সতর্ক থাকার পরামর্শ
একই সময়ে একাধিক ভাইরাসের সংক্রমণ থাকায় জ্বরের কারণ নির্ণয় চিকিৎসকদের জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একদিকে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে উপসর্গের মিল থাকায় অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পরীক্ষা প্রয়োজন হচ্ছে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় এবং রোগ নির্ণয়ে সময়ও লাগছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, শ্বাসকষ্ট, শরীরে র্যাশ, অতিরিক্ত দুর্বলতা, পানিশূন্যতার লক্ষণ কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে তীব্র শরীরব্যথা, রক্তক্ষরণের লক্ষণ বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।










