আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক লেনদেন বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের পাশাপাশি বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভ্রমণ, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং প্রবাসী আয়—সব ক্ষেত্রেই বৈদেশিক মুদ্রার দর সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে ডলার, ইউরো, পাউন্ডসহ প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে টাকার মূল্য কত, তা জানতে আগ্রহ থাকে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকেরও।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ডলারের দরে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেছে। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার জোগান থাকলেও গত মাসে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ডলারের দাম বাড়ানো এবং টাকার মান সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দর আগের তুলনায় কিছুটা বেড়ে যায়। তবে সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমানে ডলারের দাম আবার আগের অবস্থানের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে মার্কিন ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। পরবর্তী সময়ে কয়েক ধাপে দর বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় ওঠে। তবে এখন সেই অবস্থান থেকে ডলারের দাম কমেছে।
আজ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলার ১২২ টাকা ৭৮ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে। অর্থাৎ জুলাইয়ের শুরুতে থাকা ১২২ টাকা ৮৫ পয়সার তুলনায় বর্তমান দর ৭ পয়সা কম। আর সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার তুলনায় কমেছে ১ টাকা ৪ পয়সা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আজকের সর্বনিম্ন বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার নিচে তুলে ধরা হলো—
| মুদ্রার নাম | বাংলাদেশি টাকায় বিনিময় হার |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২২ টাকা ৭৮ পয়সা |
| ইউরো | ১৪২ টাকা ৫৮ পয়সা |
| পাউন্ড | ১৬৬ টাকা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৮ টাকা ৭০ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৭ টাকা ৪২ পয়সা |
| চীনা ইয়েন | ১৮ টাকা ৩০ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৬ টাকা ৮৯ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৯ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ৩৯ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৯৭ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৭১ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৬ টাকা ৯৪ পয়সা |
| সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৪৬ পয়সা |
আমদানি ব্যয়ে প্রভাব পড়তে পারে
ডলারের বিনিময় হার বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যেসব পণ্য বা কাঁচামাল ডলারে মূল্য পরিশোধ করে আমদানি করতে হয়, সেগুলোর জন্য একই পরিমাণ ডলার কিনতে তুলনামূলক কম টাকা লাগলে আমদানিকারকের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় কিছুটা কমতে পারে। তবে পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক-কর এবং অন্যান্য খরচের পরিবর্তনের কারণে শুধু বিনিময় হার কমলেই বাজারে পণ্যের দাম একই অনুপাতে কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের জন্যও বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের পাশাপাশি ইউরো, পাউন্ড, রিঙ্গিত, রিয়াল, দিরহামসহ সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রার দর তাদের মোট ব্যয়ের হিসাবেও প্রভাব ফেলে।
রেমিট্যান্স ও বাজার স্থিতিশীলতা
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি এবং প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করছে। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলে বাজারে অতিরিক্ত চাপ কমে এবং বিনিময় হারেও বড় ধরনের অস্থিরতা কম দেখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে খোলাবাজার ও আনুষ্ঠানিক বা ব্যাংকিং চ্যানেলের বিনিময় হারের ব্যবধান কমে আসা বাজারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে বিনিময় হার কোনো স্থির সংখ্যা নয়। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহ, আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের কারণে দিনের মধ্যেও দর পরিবর্তিত হতে পারে। এ কারণে ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানে লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট মুদ্রার সর্বশেষ কার্যকর হার জেনে নেওয়া জরুরি।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জে মুদ্রা কেনা ও বিক্রির ক্ষেত্রে আলাদা দর প্রযোজ্য হতে পারে। ফলে ওপরের হারগুলোকে দিনের বাজার পরিস্থিতির একটি নির্দেশক হিসেবে দেখা উচিত; লেনদেনের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর হারই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।










