বাগেরহাটের কচুয়ায় একই পরিবারের মা, ছেলে ও নানিকে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের দাবি, পরকীয়ার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি বিরোধের জেরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তিনজনকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন নিহত পরিবারের নিকটাত্মীয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাগেরহাট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার।
গ্রেপ্তার তিনজন হলেন কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি জাহিদুল ইসলাম, আসাদুল শেখ এবং মোহাম্মদ আরিফ হাওলাদার ওরফে বাবু। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে নিহতদের ব্যবহৃত চারটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, গত ৪ আগস্ট কচুয়ার চান্দেরখোলা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে একই পরিবারের তিনজনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে কাজ শুরু করে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে চান্দেরখোলা গ্রাম থেকে আসাদুল শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরিফ হাওলাদার ওরফে বাবুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে জাহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁদের বক্তব্য ও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে আরও যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে নিহত পরিবারের এক নারীর কথিত পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে জাহিদুলের পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে নিহত মনিরা বেগমের সঙ্গেও তাঁর বিরোধ ও বাকবিতণ্ডা হয়। পুলিশের দাবি, ওই বিরোধ থেকেই জাহিদুল ওই পরিবারের সদস্যদের হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরে আসাদুল ও আরিফকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।
তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ঘটনাস্থল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গতিবিধি খতিয়ে দেখেছে পুলিশ। নিহতদের ব্যবহৃত চারটি মুঠোফোন উদ্ধার হওয়ায় তদন্তে প্রযুক্তিগত তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের পুরো সময়রেখা কীভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানায়নি।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২ আগস্ট বিকেলের পর। ওই সময় থেকে পরিবারের তিন সদস্যের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। স্বজনেরা তাঁদের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর, ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় নিজ বাড়ি থেকে তাঁদের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হলেন চান্দেরখোলা গ্রামের মৃত আবদার আলী হাওলাদারের ছেলে আহাদ হাওলাদার, তাঁর মা মনিরা বেগম এবং মনিরার মা রাশিদা বেগম। রাশিদা বেগম বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রশীদের স্ত্রী ছিলেন।
মরদেহ উদ্ধারের পর নিহত আহাদ হাওলাদারের বড় ভাই ফয়সাল হাওলাদার কচুয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এরপর থেকেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী কারণে একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে, তা জানতে তদন্ত শুরু হয়।
একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে নিজ বাড়ি থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরে তদন্তে পরিচিত ও একই এলাকার ব্যক্তিদের নাম সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায়।
পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা হবে। উদ্ধার করা মুঠোফোনসহ অন্যান্য সম্ভাব্য আলামতও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনজন গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কথিত সম্পর্কজনিত বিরোধের পাশাপাশি অন্য কোনো কারণ বা সহযোগী ছিল কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।










