আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে অতিমাত্রায় আমদানি-নির্ভর করে তোলা হয়েছে—এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ও সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। তাঁর দাবি, ওই সময়ে সরকার একদিকে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে কূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়েছে, অন্যদিকে বাড়তে থাকা চাহিদা সামাল দিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তুলেছে।
সম্প্রতি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৫ বছর ৭ মাসের জ্বালানি খাতের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো। তখন বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির পরিমাণ ছিল শূন্য।
আরাফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে নতুন কূপ খনন এবং গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তাঁর দাবি, ওই সময়ে প্রায় ১৫৫টি কূপ খনন করা হয় এবং ছয়টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এসব উদ্যোগ থেকে নিট প্রায় ১ হাজার ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের দিকে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন দৈনিক ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে গ্যাসের চাহিদা একই সময়ে দ্রুত বাড়তে থাকে। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের সঙ্গে জ্বালানির প্রয়োজনও বেড়ে যায়। আরাফাতের মতে, শুধু দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে এই বাড়তি চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে পূরণ করা কঠিন ছিল।
তিনি আরও বলেন, গ্যাসের উৎপাদন কোনো স্থির বিষয় নয়। দীর্ঘদিন উত্তোলনের ফলে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র ও কূপের উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। নতুন কূপ খনন বা নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন হ্রাস মোট সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে নতুন উৎস তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতে ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
আরাফাতের বক্তব্যে গ্যাস অনুসন্ধানের দীর্ঘমেয়াদি চরিত্রের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করতে সময় প্রয়োজন হয়। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান একই সঙ্গে ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদি এবং অনিশ্চিত হওয়ায় ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় রেখে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা জরুরি ছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেয়। আমদানি করা গ্যাস গ্রহণ, সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন হওয়ায় এ ধরনের ব্যবস্থা আগে থেকেই গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরাফাতের মতে, গ্যাস আমদানির অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি শুধু আমদানি বাড়ানোর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। তাঁর দাবি, অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে একদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানির পথ তৈরি—দুই উদ্যোগই একই সময়ে নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাস পাওয়ার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানির ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন ছিল। তাঁর দাবি, এই অবকাঠামো না থাকলে পরবর্তী সময়ে সরবরাহ ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারত।
এলএনজি আমদানির অবকাঠামো নির্মাণের জটিলতার কথাও তুলে ধরেছেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের গ্যাস গ্রহণ ও পুনঃগ্যাসীকরণের জন্য বিশেষায়িত টার্মিনালসহ নানা ধরনের স্থাপনা প্রয়োজন হয়। এসব অবকাঠামো রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াকে তিনি প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানি-নির্ভর করে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে আরাফাত বলেন, শুধু বিদেশ থেকে গ্যাস আনার বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারের সামগ্রিক জ্বালানি নীতি মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। তাঁর দাবি, একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কূপ খনন এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান গ্যাস সংকট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও একটি সামগ্রিক চিত্র বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু কত পরিমাণ গ্যাস আমদানি হয়েছে, সেটি দেখলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। দেশের মোট চাহিদা, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন কূপ ও গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উৎপাদন এবং আমদানির জন্য তৈরি অবকাঠামো—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলেই জ্বালানি খাতের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হবে।
আরাফাতের বক্তব্য মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের জ্বালানি নীতি নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাব। তিনি মনে করেন, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘাটতি পূরণে আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাই শুধু তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির উদ্যোগকে ভিত্তি করে বাংলাদেশকে পুরোপুরি আমদানি-নির্ভর করে ফেলার অভিযোগকে তিনি বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করেছেন।










