,

এলএনজি অনিশ্চয়তায় গভীর হচ্ছে দেশের গ্যাস সংকট

দেশের চলমান গ্যাস সংকট এখন জ্বালানি খাতের গণ্ডি পেরিয়ে অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপরও চাপ তৈরি করেছে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের স্বল্পতায় উৎপাদন কমছে, কোথাও কার্যক্রম বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে। রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। আবাসিক গ্রাহকদের অনেকেই নিয়মিত চুলা জ্বালাতে পারছেন না।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে দেশের গ্যাসের চাহিদা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে এলএনজি আমদানি নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। ফলে শুধু বর্তমান ঘাটতি পূরণ নয়, আগামী দিনের বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ১৭০ কোটি ঘনফুট

পেট্রোবাংলার শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ওই দিন মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট।

অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির বড় প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। জাতীয় গ্রিডের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট হলেও তারা পাচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট। ফলে কেন্দ্রগুলো চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। এর সঙ্গে কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা ও জ্বালানি ঘাটতি যুক্ত হয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গিয়ে তাই লোডশেডিং বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে।

গ্রীষ্মে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। বছরে চাহিদা ১০ শতাংশ হারে বাড়লে দুই বছর পর তা প্রায় ২১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ, আগামী দুই বছরে বর্তমান গ্যাস ঘাটতি কিছুটা কমলেও বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

ছয় বছরে কমেছে দেশীয় সরবরাহ

গ্যাস সংকটের পেছনে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়াকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যেত প্রায় ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট।

বর্তমানে মোট সরবরাহ নেমে এসেছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। দেশীয় উৎসের সরবরাহও কমে হয়েছে প্রায় ১৬২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় বছরে দেশের মোট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৮৩ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট বা ২৬ দশমিক ২ শতাংশ।

দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন এবং পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ১৫০টি কূপের পরিকল্পনার মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। এসব কাজের মাধ্যমে প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ঘনফুট বাড়তি গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

তিতাস, বাখরাবাদ, মোবারকপুর ও সুনেত্র এলাকায় গভীর কূপ খননের উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক এবং ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অনুসন্ধান ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বাপেক্সের জন্য দুটি নতুন রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে। ভূকম্পন জরিপ, সম্ভাবনাময় কাঠামো চিহ্নিত করা, কূপ খনন এবং পরে উৎপাদনে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা সহজ নয়। ফলে স্বল্পমেয়াদে ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকছেই।

এলএনজি আমদানিতেও অনিশ্চয়তা

দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি সামাল দিতে এলএনজি বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হয়ে উঠেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এই নির্ভরতার ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। এতে দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কার্গো সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশে ৬৮টি এলএনজি কার্গো এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭১টি। জুলাই ও আগস্টে চলতি বছর কার্গো এসেছে ১৫টি, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২১টি।

এর মধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন বন্ধ থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকার কথা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই দুই মাসে অন্তত ২০টি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে। চাহিদার সময়ে প্রয়োজনীয় কার্গো নিশ্চিত করা তাই সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন টার্মিনালে কতটা স্বস্তি মিলবে

আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমইসিকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি হওয়ার পর প্রায় ২১ মাসের মধ্যে টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে নতুন টার্মিনাল দিয়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। এতে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো আর সেই সক্ষমতা নিয়মিত ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। অতিরিক্ত গ্যাস পেতে হলে পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো কিনতে হবে। তার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, সরবরাহকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনা—সবই নিশ্চিত করতে হবে।

আপাতত বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা

গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল ও কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ খাতে সরকার প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

ফার্নেস তেল দিয়ে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২১ টাকা ৫১ পয়সা। অন্যদিকে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ ডলার হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ২৩ টাকার বেশি হতে পারে। এ হিসাবে সংকটের সময়ে কিছু ক্ষেত্রে তেলচালিত কেন্দ্র ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু কারিগরি সমস্যা এবং কয়লা সরবরাহের ঘাটতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের নিচে ছিল।

তেল ও কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে সাময়িক চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ঝুঁকিমুক্ত সমাধান নয়। আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা

গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু একটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণ বা কয়েকটি নতুন কূপ খননের ওপর নির্ভর করছে না। দেশীয় উৎপাদন ধরে রাখা, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন জ্বালানির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার—সবগুলোকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন এলাকায় অনুসন্ধান ও কূপ খননের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও স্বল্পমেয়াদি ক্রয়ের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু তাৎক্ষণিক বাজারনির্ভর আমদানি দিয়ে চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। তেল ও কয়লার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা গেলে কোনো একটি উৎসে সংকট তৈরি হলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম পড়তে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পেশাজীবী এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। কারণ বর্তমান সংকটের প্রভাব শুধু গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধ নেই। শিল্পের উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

দুই বছর পর পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং আগামী দুই বছরে চাহিদা কতটা বাড়বে, দেশীয় উৎপাদন কতটা ধরে রাখা যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় এলএনজি কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি। তাই সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা যেমন দরকার, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও এখন থেকেই কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।