,

গাজী মাজহারুল আনোয়ার: গানের কথায় অমর এক স্রষ্টা

“একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়”—এই আকুল উচ্চারণে যেমন মিশে আছে জন্মভূমির প্রতি টান, তেমনি বাংলা গানের দীর্ঘ ইতিহাসে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম জড়িয়ে আছে দেশপ্রেম, ভালোবাসা, বিরহ ও মানুষের অনুভূতির সঙ্গে। তাঁর লেখা অসংখ্য গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকেনি; সময়ের নানা বাঁকে সেগুলো মানুষের আবেগ ও স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার তালেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি গীতিকার হিসেবে যেমন খ্যাতি অর্জন করেছেন, তেমনি সুরকার, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। বাংলা সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান তাই শুধু গানের জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

১৯৬৪ সালে রেডিও পাকিস্তানে গান লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাদার গীতিকারজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি গান ও নাটক রচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের গানের জগতে তাঁর প্রবেশ ঘটে। এরপর চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়। গান লেখার পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, প্রযোজনা ও পরিচালনায়ও তিনি কাজ করেন।

১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নান্টু ঘটক’ ছিল তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে তাঁর বহুমুখী সৃজনশীলতা বাংলা সংস্কৃতির পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ২০ হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন বলে বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের খ্যাতিমান শিল্পী তাঁর লেখা গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গানের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা। “জয় বাংলা বাংলার জয়” কিংবা “একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়”—এ ধরনের গান বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বদেশের প্রতি মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে। তাঁর গান শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়নি; পরবর্তী প্রজন্মও সেসব গান নতুন করে আবিষ্কার করেছে।

তাঁর সৃষ্টির আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল ভাষার সরলতা। জটিল শব্দের ভার না বাড়িয়ে পরিচিত শব্দ ও সহজ বাক্যে তিনি গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন। ফলে প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, মানবিকতা কিংবা দেশপ্রেম—যে বিষয়েই লিখেছেন, তা শ্রোতার কাছে সহজে পৌঁছেছে। তাঁর গানে কখনো ব্যক্তিগত আবেগ, কখনো মানুষের সামাজিক বাস্তবতা, আবার কখনো মাতৃভূমির প্রতি নিবেদন উঠে এসেছে।

তাঁর লেখা একাধিক গান বিবিসি বাংলার জরিপে নির্বাচিত সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। এই স্বীকৃতি তাঁর গীতিকর্মের জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

রাষ্ট্রীয়ভাবেও তাঁর অবদানের স্বীকৃতি মিলেছে। ২০০২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। পরে ২০২১ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এ ছাড়া দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বাচসাস পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন।

ব্যক্তিজীবনেও তাঁর সৃষ্টির উত্তরাধিকার বহমান। তাঁর কন্যা দিঠি আনোয়ার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও টেলিভিশন আয়োজনে বাবার লেখা গান পরিবেশন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সৃষ্টির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একটি সংযোগ তৈরি হয়েছে।

২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে মারা যান এই কিংবদন্তি গীতিকার। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা সংস্কৃতি হারায় এমন একজন স্রষ্টাকে, যিনি কয়েক দশক ধরে গান ও চলচ্চিত্রের নানা ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন।

তবে একজন গীতিকারের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর লেখা শব্দে। সেই অর্থে গাজী মাজহারুল আনোয়ার আজও উপস্থিত তাঁর অসংখ্য গানে। “আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল” থেকে “একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়”—তাঁর সৃষ্টির নানা পঙ্‌ক্তি মানুষের স্মৃতি ও অনুভূতিতে জায়গা করে নিয়েছে।

সময় বদলেছে, বদলেছে গান শোনার ধরনও। কিন্তু মানুষের প্রেম, বিরহ, শেকড় ও দেশকে ঘিরে যে অনুভূতিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম একইভাবে বয়ে চলে, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গান সেই অনুভূতিগুলোকেই বারবার স্পর্শ করে।

তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি তাই তাঁর সৃষ্টিকে থামিয়ে দেয়নি। বাংলা গানের ভুবনে তাঁর লেখা ও রেখে যাওয়া সৃষ্টিসম্ভার তাঁকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে। গানের কথায়, মানুষের স্মৃতিতে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম থেকে যাবে একজন বহুমাত্রিক স্রষ্টা হিসেবে।

গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয় বাংলা গানের এই কিংবদন্তি গীতিকবিকে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।