গুজরাতি সঙ্গীতজগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রয়াত হয়েছেন প্রখ্যাত সুরকার, গায়ক ও সঙ্গীত আয়োজক গৌরাঙ্গ ব্যাস। ২ সেপ্টেম্বর রাতে আহমেদাবাদে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। কয়েক দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে গুজরাতি চলচ্চিত্র, লোকসঙ্গীত, ভক্তিগীতি ও ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন এই শিল্পী। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
গৌরাঙ্গ ব্যাস ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার ও পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত অবিনাশ ব্যাসের সন্তান। সংগীতের এমন সমৃদ্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠলেও নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠায় তিনি বাবার খ্যাতির ওপর নির্ভর করেননি। নিজস্ব সুরের ধরন, সৃষ্টিশীলতা এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের মাধ্যমে গুজরাতি সঙ্গীতাঙ্গনে আলাদা অবস্থান তৈরি করেন।
শৈশবেই সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হারমোনিয়ামে ‘বৈষ্ণব জন’ বাজানোর মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গীতচর্চার সূচনা হয়। পরে সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে পরিণত হয় পেশাগত সাফল্যে।
তবে সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পথটি শুরুতে এতটা সরল ছিল না। কর্মজীবনের প্রথম দিকে গৌরাঙ্গ ব্যাস প্রকৌশল পেশায় যুক্ত ছিলেন এবং একটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করেন। কিন্তু সুর ও সঙ্গীতের প্রতি গভীর টান তাঁকে শেষ পর্যন্ত পেশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। চাকরি ছেড়ে তিনি পুরোপুরি সঙ্গীতচর্চায় মন দেন।
পেশাদার সঙ্গীতজীবনের শুরুতে বাবার সহকারী হিসেবে গুজরাতি চলচ্চিত্র ‘জেসাল তোরাল’-এ কাজ করেন তিনি। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর নিজস্ব সৃষ্টিশীল পথ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর ‘লাখো ফুলানি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে স্বতন্ত্র সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন গৌরাঙ্গ ব্যাস। এই ছবিতে কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারের সঙ্গে গুজরাতি গানে কাজ করার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি।
দীর্ঘ কর্মজীবনে শতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গৌরাঙ্গ ব্যাস। তাঁর কাজের পরিধি শুধু চলচ্চিত্রের সঙ্গীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। গুজরাতের লোকজ সুর, ভক্তিমূলক গান এবং ঐতিহ্যবাহী সংগীতধারাকেও তিনি নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন। কেতন মেহতার ‘ভাবনী ভাবাই’সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।
‘মানিয়ারো’, ‘নসিবনী বালিহারি’, ‘পারকি থাপন’, ‘লিলুড়ি ধরতি’ এবং ‘মাইয়ারমান মন্দু নথি লাগতু’ তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে। তাঁর সুর করা ‘মানিয়ারো তে হালু হালু থাই রে ভিয়ো’ এবং ‘হু তু তু তু, জমি রমতনি ঋতু’ গানও গুজরাতি শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
দেশের একাধিক খ্যাতনামা শিল্পীর সঙ্গেও কাজ করেছেন গৌরাঙ্গ ব্যাস। তাঁর কর্মজীবনে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার, মান্না দে, মহেন্দ্র কাপুর, সুমন কল্যাণপুর, ভূপিন্দর সিংহ ও প্রফুল্ল দাভের মতো শিল্পীদের সঙ্গে কাজের সুযোগ আসে। ফলে গুজরাতি সঙ্গীতের পাশাপাশি বৃহত্তর ভারতীয় সঙ্গীতাঙ্গনেও তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়েছিল।
চলচ্চিত্রের বাইরে ভক্তিমূলক ও লোকসঙ্গীতভিত্তিক অ্যালবামেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। ‘জলারামনি ঝুপড়ি’, ‘ভজন অনমোল’, ‘গঙ্গা সতিনাঁ ভজনো’, ‘কহত কবীর’, ‘জলারাম বাপানু হালারড়ু’, ‘প্রাচীন প্রভাতিয়াঁ’ এবং ‘নন-স্টপ ডান্ডিয়া-রাস’ তাঁর উল্লেখযোগ্য অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সঙ্গীত পরিচালনায় তাঁর দীর্ঘ সাফল্যের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। কর্মজীবনে প্রায় ১১টি রাজ্য পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালনার পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। ২০২২ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেন। ২০২৪ সালে গুজরাত রাজ্য সঙ্গীত অ্যাকাডেমি এবং গুজরাত পর্যটন দপ্তরের পক্ষ থেকেও তাঁর সঙ্গীতজীবনের অবদানকে সম্মান জানানো হয়।
গৌরাঙ্গ ব্যাসের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসার পর তাঁকে স্মরণ করে শোকবার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গৌরাঙ্গ ব্যাসের সঙ্গে নিজের একটি ছবি প্রকাশ করে মোদি বলেন, অবিনাশ ব্যাসের সমৃদ্ধ সঙ্গীত ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে গৌরাঙ্গ ব্যাস গুজরাতি সঙ্গীতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন। তাঁর প্রয়াণে গুজরাত একজন প্রতিভাবান স্রষ্টাকে হারিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি প্রয়াত শিল্পীর পরিবার ও অসংখ্য অনুরাগীর প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
গৌরাঙ্গ ব্যাসের জীবন ছিল সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক সম্পৃক্ততার গল্প। প্রকৌশল পেশা থেকে সঙ্গীতজগতে আসা, চলচ্চিত্রে কাজ, খ্যাতনামা শিল্পীদের সঙ্গে সৃষ্টিশীল সহযোগিতা এবং লোক ও ভক্তিমূলক সঙ্গীতের চর্চা—সব মিলিয়ে গুজরাতি সঙ্গীতে তাঁর অবদান ছিল বিস্তৃত। ৮৭ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ সঙ্গীতযুগের অবসান ঘটল। তাঁর রেখে যাওয়া গান, সুর ও সঙ্গীতকর্মই এখন শ্রোতা ও শিল্পীদের কাছে তাঁর স্মৃতির অন্যতম প্রধান উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।










