জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

৪ হাজার ৫৯৭ কোটির প্রকল্প এখন ১৬ হাজার কোটি

ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় দুই দফা সংশোধনের পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কাজের অগ্রগতির সময়কাল নিয়েও। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় ব্যয় বাড়ানোর সময় প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ছিল ১০ শতাংশেরও কম। সাধারণত প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে নকশা পরিবর্তন, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত কাজের কারণে ব্যয় সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি যখন এত কম, তখন বিপুল পরিমাণ ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পটির তৃতীয় ধাপ প্রথমে ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন করা হয়। পরে প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় আরও বাড়িয়ে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। ফলে কয়েক ধাপে প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় প্রায় সাড়ে তিন গুণে পৌঁছেছে।

এদিকে একই ধরনের পানি শোধনাগার প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করলেও সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে সায়েদাবাদের তুলনায় বেশি পানি শোধনের সক্ষমতা রয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় পাইপলাইনও তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ। এরপরও গন্ধর্বপুর প্রকল্পের ব্যয় সায়েদাবাদ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয়ের চেয়ে কম।

এ কারণে সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ, সংশোধিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় সামনে এসেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ ও সংশোধনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা আর্থিক স্বার্থ জড়িত ছিল কি না, সেটিও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

ব্যয় বাড়ানোর সময় দায়িত্বে ছিলেন আসিফ মাহমুদ

সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং তা তদন্তে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে যথাযথ কারিগরি ও আর্থিক বিশ্লেষণ ছিল কি না এবং কোনো ধরনের অনিয়ম ঘটেছিল কি না—অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেসব বিষয় যাচাই হওয়ার কথা।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠতে পারে ব্যয়ের বিষয়

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ কমিশনে এসেছে। অভিযোগগুলো যাচাই করতে ইতোমধ্যে একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন সায়েদাবাদ প্রকল্পকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় কীভাবে দুই দফায় বেড়ে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকায় পৌঁছাল। মাত্র ১০ শতাংশের কম কাজের অগ্রগতির পর্যায়ে এত বড় ব্যয় সংশোধনের প্রয়োজন কেন দেখা দিয়েছিল, সংশোধিত ব্যয়ের পেছনে কী ধরনের কারিগরি ও আর্থিক হিসাব ছিল এবং একই ধরনের অন্য প্রকল্পের তুলনায় ব্যয় এত বেশি হওয়ার কারণ কী—এসব বিষয়ই অনুসন্ধানে গুরুত্ব পেতে পারে।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে কোনো অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়ার কথা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে বিপুল অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি এবং কম অগ্রগতির সময়ে সংশোধিত অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর