জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

দুই লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করল মালয়েশিয়া

বাংলাদেশ থেকে ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা নাকচ করে দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটির মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্যকে ঢাকা বা কুয়ালালামপুরের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ঠিক এর চার দিন আগে সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনারের বৈঠকের পর এই ২ লাখ কর্মী নিয়োগের খবরটি সামনে এসেছিল।
এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তনে দেশের শ্রমবাজারে নতুন করে অস্পষ্টতা এবং শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুরনো জটিলতা, এজেন্সি বা সিন্ডিকেট বিতর্ক এবং উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের তিক্ত ইতিহাস। অতীত ঘেঁটে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার মানেই নানা সময় নানা অনিয়ম আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। ২০০৯ সালে প্রথমবার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে ১০ এজেন্সির মাধ্যমে বাজারটি পুনরায় চালু হলেও তা সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে। সে সময় জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে ৩৭ হাজার টাকা খরচ নির্ধারিত থাকলেও প্রতিটি কর্মীর কাছ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে কুয়ালালামপুর সেই বাজার আবার বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির আওতায় মালয়েশিয়া সরকার ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা প্রকাশ করে, যার সিংহভাগ মালিকানায় ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও মন্ত্রী-এমপিরা। সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলসহ মোট ৭৬টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলেও মূলত ওই ২৫ এজেন্সির হাতেই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত এই কাঠামোর আওতায় প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ জন কর্মী দেশটিতে পাড়ি জমান। কাগজে-কলমে অভিবাসন ব্যয় ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবায়নের মাঠে গড়ে পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছিল। ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ৩১ মে কুয়ালালামপুর আবারও বাংলাদেশিদের জন্য তাদের শ্রমবাজার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। সে যাত্রায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও শেষ মুহূর্তে প্রায় ১৭ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হন।
চলতি বছর জুনে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে বাজারটি পুনরায় চালুর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি এফডব্লিউসিএমএস প্ল্যাটফর্মে ২৫টি মূল এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি সহযোগী এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম সারির ২৫ এজেন্সির অধীনে ১০টি করে অ্যাসোসিয়েট এজেন্ট এবং বোয়েসেলের অধীনে আরও ৬২টি এজেন্সি কাজ করার কথা রয়েছে। তবে জনশক্তি খাতের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই জটিল কাঠামো আদতে আগের সেই পুরোনো সিন্ডিকেটেরই নতুন রূপ। সাব-এজেন্টরা যদি স্বাধীনভাবে কর্মী পাঠাতে না পেরে ওই নির্দিষ্ট ২৫ প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকে, তবে অভিবাসন ব্যয় কমার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের কাঁধে ঋণের বোঝা আরও মারাত্মকভাবে বাড়বে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত এই সিন্ডিকেট বলয় ভেঙে স্বচ্ছ ও ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে কর্মী পাঠানো সম্ভব হয় কি না।
Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর