সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি সময়ে বিভাগটিতে হাম ও এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৪ জনে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম।
মারা যাওয়া দুই শিশুর একজন আয়ান। তার বয়স চার মাস ২০ দিন। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্য শিশুটি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ইব্রাহিম। তার বয়স এক বছর দুই মাস। হবিগঞ্জের শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল সে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৯৯ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১৫৪ জন। এক দিনে এতসংখ্যক রোগী ভর্তি হওয়ায় শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় সিলেট বিভাগে ১ হাজার ৩১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে মৃত্যুর সবগুলো ঘটনাই পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া হাম হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ১৫৪ জনের মধ্যে মাত্র ১০ জনের ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছিল। বাকি ১৪৪ জন তীব্র হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।
ফলে হাম শনাক্তকরণে পরীক্ষার গুরুত্ব সামনে এসেছে। উপসর্গ দেখে হাম সন্দেহ করা সম্ভব হলেও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সংক্রমণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা অসুস্থ হচ্ছেন, তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা চিকিৎসা ও রোগ নজরদারি—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর হলে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।
সিলেটে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় চিকিৎসকদের জন্যও পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি আগে থেকে চিকিৎসাধীন শিশুদের পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং জটিল রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
হাম প্রতিরোধে টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় রাখা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অসুস্থ শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব রয়েছে।
তবে সিলেটের বর্তমান পরিস্থিতিতে কতজন শিশু হাম প্রতিরোধের টিকা পেয়েছে বা কতজন টিকার আওতার বাইরে রয়েছে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ১৫৪ জনের মধ্যে কতজনের ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে, সেটিও জানানো হয়নি।
নতুন করে দুই শিশুর মৃত্যু এবং এক দিনে ১৫৪ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য সিলেটের বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। বিশেষ করে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া রোগীর পাশাপাশি হামসদৃশ তীব্র উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে রয়েছে। আক্রান্তদের সঠিক রোগ নির্ণয়, সময়মতো চিকিৎসা এবং সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফল এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের অবস্থা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। আপাতত স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে হাম ও এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১৫৪ জনে পৌঁছেছে।









