দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছর মশাবাহিত এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১০০ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন নতুন করে ১ হাজার ৩২৪ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭ হাজার ১৭০ জন; তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ১০২ জন।
গত এক দিনে যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের মধ্যে দুজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। অন্য তিনজনের মধ্যে একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, একজন চট্টগ্রাম বিভাগ এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের।
চলতি বছরে মৃত্যুর হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা। এ পর্যন্ত সেখানে ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। খুলনা বিভাগে মারা গেছেন ১৮ জন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে নয়জন, চট্টগ্রামে সাতজন, রাজশাহীতে চারজন এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে বিভাগের অন্যান্য এলাকায় তিনজন মারা গেছেন। রংপুর ও সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে একজন করে রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
শুধু মৃত্যুই নয়, নতুন রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৪১ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা জেলার অন্যান্য এলাকায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ২৯৮ জন।
ঢাকার বাইরে নতুন রোগী ভর্তির দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে খুলনা বিভাগ। গত এক দিনে সেখানে ২৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ১৩৯ জন, বরিশালে ১২১ জন এবং রাজশাহীতে ১১৪ জন। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ৮৭ জন, রংপুরে ৩৪ জন এবং সিলেটে পাঁচজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন।
আগস্টে সংক্রমণের বড় উল্লম্ফন
মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতা স্পষ্ট। চলতি বছরের মধ্যে আগস্টে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। শুধু এই মাসেই আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। একই সময়ে মারা গেছেন ৪৩ জন, যা এ বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা।
অর্থাৎ, বছরের মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর অর্ধেকেরও বেশি আগস্ট মাসেই চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এতে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কতটা দ্রুত বেড়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ বাড়ছে।
ডেঙ্গু মূলত এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। শহরাঞ্চলে বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন স্থাপনা, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্রসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। তাই আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আগের বছরের তুলনায় পরিস্থিতি
দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য ২০০০ সাল থেকে সংরক্ষণ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই দীর্ঘ সময়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। একই বছর ডেঙ্গুতে মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন—যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।
গত বছরও পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২ হাজার।
চলতি বছরের হিসাব সেই তুলনায় এখনো কম হলেও আগস্টে সংক্রমণ ও মৃত্যুর দ্রুত বৃদ্ধি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বছরের শুরু থেকে ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃতের সংখ্যা ১০২-এ পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মৌসুমি অভিযান যথেষ্ট নয়; মশার প্রজননস্থল নিয়মিত ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হয়। পাশাপাশি জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা বা ডেঙ্গুর অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রোগীর অবস্থা খারাপ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।
মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এক মাসে ২০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য বলছে, চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগেও রোগীর চাপ বাড়ছে। ফলে চিকিৎসার প্রস্তুতির পাশাপাশি সংক্রমণ কমাতে মশা নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতার কার্যক্রম আরও জোরদার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।









