জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

দুই বছরের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের লক্ষ্য সরকারের

আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশের গ্রাম ও শহরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, নতুন অবকাঠামো তৈরি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আগে রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রাখার বিপরীতে গ্রামাঞ্চলে বেশি লোডশেডিং দেওয়ার যে ব্যবস্থা ছিল, সরকার তা থেকে সরে এসেছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের সাময়িক চাপ শহর ও গ্রামের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সমভাবে বণ্টনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের অন্যতম বড় পরিকল্পনা হলো নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল স্থাপন। তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন টার্মিনাল স্থাপনে প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। এটি চালু হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সক্ষমতা বাড়বে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানির মাধ্যমে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান বাড়াতে এসব উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরুর মাধ্যমে। তথ্য উপদেষ্টা জানান, চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই কেন্দ্রটির পরীক্ষামূলক চালুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী বছর থেকে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়েও সরকারের একটি সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরা হয়। তথ্য উপদেষ্টা জানান, সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে মালয়েশিয়া ১০ হাজার নতুন কর্মী নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্মীদের বিমান ভাড়াসহ সম্পূর্ণ বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আগের নিয়োগব্যবস্থার পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পূর্বে অনুমোদিত ২৫টি প্রধান নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরও ৩১২টি সংস্থাকে সহযোগী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ওঠে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এটি হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো নতুন সংকট নয়। তাঁর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে নিখোঁজ-সংক্রান্ত ১৩ হাজার ৮৭৬টি সাধারণ ডায়েরি নথিভুক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সাত মাসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭টিতে। তিনি বলেন, পরিসংখ্যানের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখে প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। দেশে ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট ও ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটসহ বিভিন্ন ধরনের সারের মোট মজুত ১২ লাখ ৮৬১ মেট্রিক টন রয়েছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। গত বছরের একই সময়ে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার মজুতের পরিমাণ বেশি। তবে শুধু পর্যাপ্ত মজুত থাকলেই হবে না, সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়ম বন্ধ করে কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সাংবাদিকদের চাকরি ও জীবিকার নিরাপত্তার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সংবাদকর্মীদের অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণেও নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এসব যানবাহনের যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য, চলাচলের রুট এবং অন্যান্য বিষয় নির্ধারণে স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে একটি সুনির্দিষ্ট বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয় বিবেচনায় সরকারি পে-স্কেলে মাসিক ৩ হাজার টাকা হারে ভাতা রাখার বিষয়টিও তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা। এ ধরনের পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সুবিধা রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া এলাকায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগকেও দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। ডেনমার্কের সহায়তায় এই টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়বে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। বন্দরের সক্ষমতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ এবং তথ্য অধিদপ্তরের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর