রাজধানীর পশ্চিম জুরাইনে একটি হাফেজি মাদ্রাসার চারতলা ভবন থেকে পড়ে ইয়ামিন নামে ১০ বছরের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত ইয়ামিন কদমতলীর মোহাম্মদবাগ এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম রফিকুল ইসলাম। পশ্চিম জুরাইনের তাসফিলুল কোরআন হাফেজি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সে।
পরিবার ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, গত বুধবার ছুটি পেয়ে ইয়ামিন বাড়িতে গিয়েছিল। ছুটি শেষে আবার মাদ্রাসায় ফেরার সময় সে সেখানে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে মাদ্রাসায় রেখে আসেন। মাদ্রাসায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ফেরদৌস আহমেদ জানান, ইয়ামিন মাদ্রাসায় ফিরতে চাইছিল না। এ বিষয়ে তার বাবা অধ্যক্ষকে ফোন করে শিশুটিকে বুঝিয়ে মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তবে অধ্যক্ষ নিজে তাকে আনতে যাননি। রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ইয়ামিনের নানী তাকে মাদ্রাসায় পৌঁছে দেন।
অধ্যক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসায় আসার কিছুক্ষণ পর ইয়ামিনকে চারতলার সিঁড়িঘরে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে তাকে রাতের খাবারের জন্য নিচে যেতে বলা হয়। এরপর অধ্যক্ষ সেখান থেকে চলে যান। কিছু সময় পরই তিনি খবর পান, ইয়ামিন চারতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেছে।
খবর পেয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ভবনের নিচ থেকে শিশুটিকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে ইয়ামিন কীভাবে চারতলার ছাদে উঠেছিল এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে সেখান থেকে নিচে পড়ে গেল, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও ঘটনার প্রত্যক্ষ কারণ জানাতে পারেনি। ফলে শিশুটির ছাদে যাওয়ার বিষয়টি, ঘটনার সময় সেখানে কারা ছিলেন এবং ছাদে শিক্ষার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ঘটনার পর শিশুটির মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, বিষয়টি কদমতলী থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে।
তবে পরদিন দুপুরে কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ আশরাফুজ্জামান জানান, এ ঘটনায় থানায় কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেনি। তিনি বলেন, একটি মাদ্রাসা থেকে পড়ে একটি শিশু আহত হওয়ার খবর তারা পেয়েছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
ইয়ামিনের মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ঘটনার সময় ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি। কারণ, শিশুটি মাদ্রাসায় ফিরতে অনিচ্ছুক ছিল এবং পরিবারের সদস্যরা তাকে সেখানে রেখে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। এই দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার হতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ করে চারতলা ভবনের ছাদে শিক্ষার্থীদের প্রবেশের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, সেখানে নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল কি না এবং শিক্ষার্থীদের চলাচল কীভাবে তদারক করা হতো—এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন। তবে এসব ব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেই হয়তো ইয়ামিনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একটি শিশুর আকস্মিক মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই শোক নেমে এসেছে তার পরিবারে। কিন্তু শোকের পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ জানাও জরুরি। ইয়ামিন দুর্ঘটনাবশত ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিল, নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতিতে সেখানে গিয়েছিল—এখন পর্যন্ত তার কোনোটি নিশ্চিত নয়। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করাই শ্রেয়।









