জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

প্রতিদিন ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার ক্ষতি

জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে ক্রমেই বড় চাপ তৈরি করছে। গ্যাসের স্বল্পতা, বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়ম এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের বাড়তি ব্যয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব এখন শুধু বড় শিল্পকারখানায় সীমাবদ্ধ নেই; ওষুধ, বস্ত্র, সিরামিক, চিনি পরিশোধন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের কারণে সারা দেশে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় থাকা ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদনের সঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ আটকে আছে।

রোববার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ : ব্যবসার পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যবিষয়ক দপ্তর এতে সহযোগিতা করে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি. রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ফজলুল হক। আলোচনা সঞ্চালনা করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ সহযোগী হাসিব হাসান।

কমেছে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। শিল্পে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি ও অনিশ্চয়তাকে উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আলোচনায় তুলে ধরা হয়।

গত চার বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময়ে আমদানিনির্ভরতা ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বা সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে দ্রুত এসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য সমস্যাটি শুধু জ্বালানি পাওয়া না-পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখন সরবরাহ কমবে, কতক্ষণ উৎপাদন চালানো সম্ভব হবে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হলে কতটা অতিরিক্ত ব্যয় হবে—এসব অনিশ্চয়তা ব্যবসার দৈনন্দিন পরিকল্পনাকেও জটিল করে তুলছে।

শিল্পাঞ্চলে সংকটের চিত্র আরও তীব্র

নরসিংদীতে ৩০০টির বেশি কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জেলাটিতে প্রায় ৩ হাজার বস্ত্র ও রং করার কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা দেশের স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয়। গ্যাসের ঘাটতির কারণে কিছু কারখানা বয়লার চালাতে কাঠের মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে।

গাজীপুরে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। সেখানে শিল্পকারখানাগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫৯০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর প্রভাবে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

নারায়ণগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ৮৫০টি কারখানার মধ্যে ৯০০টি বন্ধ রয়েছে। ফলে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ কারখানা উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।

ময়মনসিংহে ২৯৩টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৯৯টি গ্যাসনির্ভর। সেখানে গ্যাস সংকটের কারণে গড়ে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। হবিগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় ১৭১টি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার দৈনিক উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে বৈঠকে জানানো হয়।

চট্টগ্রামেও শিল্প সক্ষমতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। জাতীয় পর্যায়ে বস্ত্র ও রং করার শিল্পে উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্পেও পড়ছে বড় ধাক্কা

জ্বালানি সংকটের প্রভাব বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও পড়েছে। এ খাতে উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ বড় শিল্পের তুলনায় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। ফলে গ্যাস বা বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যাহত হলে তাদের উৎপাদন দ্রুত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, তাদের পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে।

রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়। আবার বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয় পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করে।

৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে

নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন ঝুলে থাকার বিষয়টি শিল্প বিনিয়োগের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। এসব আবেদনের সঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ জড়িত।

গ্যাস সংযোগের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন কারখানা স্থাপন বা বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। এর ফলে একদিকে সম্ভাব্য উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

দীর্ঘমেয়াদি নীতির দাবি ব্যবসায়ীদের

বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, নির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন। কম গ্যাসের চাপ, হঠাৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।

রপ্তানিমুখী শিল্প ও বড় শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকলে আগাম ও বিশ্বাসযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে কারখানাগুলো উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং যন্ত্রপাতি পরিচালনার বিষয়ে আগেভাগে পরিকল্পনা করতে পারবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান সংকট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জ্বালানি সংগ্রহের দুর্বলতার প্রতিফলন। শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতকে সুরক্ষা দিতে একটি শিল্প জ্বালানি নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

লাফার্জহোলসিমের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১০ থেকে ২০ বছরের একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি কৌশল প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, সিরামিক শিল্পে গ্যাস শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, এটি উৎপাদন প্রক্রিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। দীর্ঘদিন সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

ইএসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকটকে শুধু সরবরাহের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ, বরাদ্দব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

নির্ভরযোগ্য সরবরাহের পাশাপাশি নতুন কৌশল

বৈঠকে বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন শিল্প বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ করা হয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহকে আরও নির্ভরযোগ্য করা, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে পূর্বানুমানযোগ্যতা আনা, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। শিল্পের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে কতটা জ্বালানি প্রয়োজন হবে, কোন খাতে কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সঙ্গে সরবরাহ কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয়ও পরিকল্পনার অংশ হওয়া দরকার বলে মত দেন আলোচকেরা।

প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ থাকা এবং প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগ আটকে থাকার তথ্য দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটের ব্যাপ্তি স্পষ্ট করছে। তাৎক্ষণিক সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা কার্যকর করতে না পারলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর