পাঞ্জাবের পরিচিত সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার মনজিৎ কৌর নির্মম এক সহিংসতার শিকার হয়ে মারা গেছেন। গত ৩ ও ৪ জুলাইয়ের মধ্যবর্তী রাতে ভয়াবহ এই হামলার পর প্রায় দুই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবনের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ২৬ আগস্ট চণ্ডীগড়ের পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিজিআইএমইআর)-এ তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঘটনাটি কেবল এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতিই নয়, বরং পাঞ্জাব পুলিশের চরম অবহেলা ও আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতাকেও সামনে এনে দিয়েছে।
মামলার নথিপত্র ও নিহতের পরিবারের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে মনজিতের দুই পরিচিত ব্যক্তি—শুভি এবং পিন্ডা—তাকে চণ্ডীগড়ের সেক্টর ৩৪ এলাকায় ডেকে পাঠায়। সেখানে পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপক্ষের কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে অভিযুক্তরা মনজিৎকে বেধড়ক মারধর করে এবং জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। চণ্ডীগড় থেকে সোজা পাঞ্জাবের রূপনগর জেলার মোরিন্ডার কাছের একটি নির্জন বনাঞ্চলে তাকে আটকে রাখা হয়।
বনের নির্জনতায় অভিযুক্ত দুজন মনজিৎকে একটি গাছে শক্ত করে বাঁধে এবং তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে স্থান ত্যাগ করে। মারাত্মকভাবে দগ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করেন তার অন্য এক পরিচিত ব্যক্তি, যিনি খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিজের কাছে থাকা কম্বল দিয়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হন। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মনজিৎকে উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
মনজিতের চিকিৎসা ও স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। প্রথমে তাকে মোরিন্ডার একটি স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে মোহালির ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে চণ্ডীগড়ের পিজিআইএমইআরে ভর্তি করা হয়। সেখানেই দীর্ঘ প্রায় আট সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
এই দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার সময় মনজিতের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশি তদন্তের বিষয়ে গুরুতর অবহেলার অভিযোগ তোলা হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় একাধিকবার মনজিৎ জ্ঞান ফিরে পান এবং পুলিশের কাছে নিজের বক্তব্য ও মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকেরা সবুজ সংকেত দেওয়া সত্ত্বেও তদন্তকারী কর্মকর্তারা সময়মতো হাসপাতালে এসে তার জবানবন্দি রেকর্ড করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, যা পরবর্তীতে মামলার আইনি ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।
গত ২৬ আগস্ট হাসপাতালে মনজিতের মৃত্যু হলে পিজিআই পুলিশ পোস্ট খারার সদর থানায় বার্তা পাঠায়। এরপরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ঘটনার এত দিন পর তদন্তকারী কর্মকর্তা হাসপাতালে আসেন। পরবর্তীতে নিহতের মাকে চণ্ডীগড়ের সেক্টর ৩৪ থানায় নিয়ে গিয়ে তার লিখিত অভিযোগ ও জবানবন্দি নথিভুক্ত করা হয়। সেই জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে চণ্ডীগড় পুলিশ একটি প্রাতিষ্ঠানিক এফআইআর (FIR) দায়ের করে। ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার পিজিআইএমইআরে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় এবং তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ওঠা বিতর্কের মুখে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে পাঞ্জাব পুলিশ। তারা জানায়, যেহেতু মূল অপহরণের ঘটনাটি ঘটেছিল চণ্ডীগড়ের সীমানায়, সেহেতু আইনি ব্যবস্থা ও মামলা পরিচালনার প্রাথমিক একতিয়ার চণ্ডীগড় পুলিশের ওপরই বর্তায়। খারার পুলিশের দাবি, তারা নিহতের পরিবারকে সম্পূর্ণ মানবিক ও আইনি সহায়তা প্রদান করেছে। সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে এখন চণ্ডীগড় থেকে মোরিন্ডার জঙ্গল পর্যন্ত পুরো ঘটনার একটি বিস্তারিত অপরাধ স্থান পুনঃনির্মাণ (Crime Scene Reconstruction) পরিচালনা করা হবে। এর পাশাপাশি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহতের জবানবন্দি গ্রহণে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল কি না, তাও বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।









