জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট: বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ স্থবির, অলস টাকার পাহাড় ৪.১৫ লাখ কোটি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক অদ্ভুত ও কঠিন তারল্য সংকটের (Liquidity Trap) বেড়াজালে আটকে পড়েছে। জুনের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত তারল্য মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রেকর্ড ৭৮ হাজার কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ঐতিহাসিক ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায়। সহজ কথায় বলতে গেলে, এই বিশাল পরিমাণ অর্থ হলো ব্যাংকের ভল্ট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জমা উইন্ডোতে পড়ে থাকা অলস ও অনুৎপাদনশীল পুঁজি, যা ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মূল অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সাধারণ পরিস্থিতিতে ব্যাংকে নগদ অর্থের আধিক্যকে আর্থিক সক্ষমতার লক্ষণ হিসেবে ধরা হলেও, এবারের এই অস্বাভাবিক অলস টাকার পাহাড় মূলত একটি বড় ধরনের সিস্টেমিক বা কাঠামোগত পক্ষাঘাতের লক্ষণ। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা আমানতে পরিপূর্ণ থাকলেও, তাদের কাছে টাকা খাটানোর বা বিনিয়োগ করার মতো নিরাপদ ও লাভজনক কোনো খাত নেই। এই অদ্ভুত বৈপরীত্য মুদ্রা প্রসারণ, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার মানসিকতা এবং স্থবির শিল্প খাতের মধ্যকার গভীর কাঠামোগত ব্যবধানকেই স্পষ্ট করে তোলে।

১. বিশাল ফারাক: আমানতের উল্লম্ফন বনাম ঋণপ্রবাহের পতন

এই অতিরিক্ত তারল্যের মূল কারণ বুঝতে হলে আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণের মধ্যকার বাড়তে থাকা বিশাল ব্যবধানের দিকে তাকাতে হবে:
  • আমানতের জোয়ার: মাসের পর মাস নেতিবাচক বাস্তব সুদের হার, তারল্য সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার পর জুন মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত বৃদ্ধির হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে ১০.৭৪ শতাংশে পৌঁছায় (যা এক বছর আগে ছিল ৭.৭৩ শতাংশ)। এর পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করেছে—এক, তীব্র মূল্যস্ফীতির মাঝেও সাধারণ আমানতকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ; এবং দুই, পরিবর্তিত মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকগুলোর আগ্রাসীভাবে আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া।
  • বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে ধস: অন্যদিকে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বেসরকারি খাত থেকে ঋণের চাহিদা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যবসার প্রসারে নতুন কোনো পরিকল্পনা না থাকায় উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছেন না। কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চলতি মূলধনের চাহিদা সংকুচিত হয়েছে। ফলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কোনো মূলধনী বিনিয়োগে না গিয়ে নিজেদের টিকে থাকা, দেনা শোধ এবং ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
যখন আমানত বাড়ছে দুই অঙ্কের ঘরে, অথচ ঋণের চাহিদা ৫ শতাংশের নিচে আটকে আছে, তখন ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটে বড় ধরনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। ফলে কোনো সুনির্দিষ্ট সুদের আয় ছাড়াই ব্যাংকগুলোকে চড়া খরচে এই আমানতের বোঝা টানতে হচ্ছে।

২. খেলাপি ঋণের বোঝা ও ব্যাংকের রক্ষণশীল মানসিকতা

বেসরকারি খাতে ঋণ ধসে পড়ার পেছনে কেবল চাহিদার ঘাটতিই দায়ী নয়, এর পেছনে ব্যাংকগুলোর অতি-রক্ষণশীল মনোভাব বা ঝুঁকি নেওয়ার অনীহাও বড় ভূমিকা রাখছে।
বহু বছর ধরে দেশের ব্যাংকিং খাত লাগামহীন খেলাপি ঋণ (NPL) ও সংকটে থাকা সম্পদের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাপের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। এখন আর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা প্রান্তিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজে ঋণ দিতে চাইছে না ব্যাংকগুলো।
  • ঋণ প্রদানে সতর্কতা: বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কমিটিগুলো এখন নতুন ঋণ ছাড় করার আগে ব্যালেন্স শিটের স্বচ্ছতা, পর্যাপ্ত বন্ধকি সম্পত্তি এবং নিখুঁت কমপ্লায়েন্স ইতিহাস কঠোরভাবে যাচাই করছে।
  • এসএমই খাতের দুর্দশা: কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইনের মূল চালিকাশক্তি মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প বা এসএমই (SME) খাতগুলো আনুষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার পথ থেকে প্রায় পুরোপুরি ছিটকে পড়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার উচ্চ ঝুঁকির কারণে এই খাতগুলোকে অর্থায়ন করার চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা ফেলে রাখা বা ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করাকেই ব্যাংকগুলো নিরাপদ মনে করছে।
ফলস্বরূপ, লাভজনক ও সচ্ছল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের চলতি মূলধন সম্প্রসারণের জন্য সহজে ঋণ পাচ্ছে না, যা শিল্প খাতের স্থবিরতাকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

৩. শিল্প খাতের প্রধান বাধা: তীব্র জ্বালানি সংকট

সমালোচকরা প্রায়শই চড়া সুদের হারকে করপোরেট ঋণ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করলেও, অভিজ্ঞ শিল্পপতি ও ব্যাংকাররা মনে করছেন যে মূলধনের ব্যয়ের চেয়েও বড় ও অস্তিত্বের সংকট হলো দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট।
টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্টিলের মতো দেশের প্রধান উৎপাদনমুখী খাতগুলোর উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে অপর্যাপ্ত গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে।
  • অপূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা: গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে গেলে বা লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন লাইন বারবার বন্ধ হয়ে গেলে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ চালানো সম্ভব হয় না।
  • বিনিয়োগে স্থবিরতা: এ ধরনের অস্থির ও অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশে কোনো উদ্যোক্তা কম সুদে ঋণ পেলেও সেই টাকা নতুন কারখানায় বা নতুন মেশিনারিজ আমদানিতে বিনিয়োগ করা অর্থনৈতিকভাবে অবাস্তব। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা না থাকলে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ অসম্ভব।
সুতরাং, কেবল মুদ্রানীতি শিথিল করে বা সুদের হার কমিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না কাঠামোগত জ্বালানি সংকট দূর হচ্ছে, ততক্ষণ তারল্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরেই বন্দি থাকবে এবং তা উৎপাদনশীল অর্থনীতির চাকা সচল করতে পারবে না।

৪. এসডিএফ (SDF) ফাঁদ: লোকসান গুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা

বেসরকারি খাতে ভালো ও ঋণযোগ্য গ্রাহক না পাওয়ায় এবং তারল্যের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চড়া সুদের সরকারি সিকিউরিটিজ পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ কোথায় খাটাবে তা নিয়ে একপ্রকার দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF) উইন্ডোর ওপর ব্যাংকগুলোর নির্ভরতা রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে।
  • এসডিএফ-এর কার্যপদ্ধতি: এসডিএফ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি স্বল্পসুদের ডিপোজিট উইন্ডো, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর হাতে জমে থাকা অতিরিক্ত ওভারনাইট তারল্য তুলে নেওয়া হয়। এসডিএফ-এর সুদের হার মাত্র ৭.৫০ শতাংশ, যা কল মানি মার্কেটের মতো অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি উপকরণের তুলনায় বেশ কম।
  • ঐতিহাসিক রেকর্ড: অন্য কোনো ভালো বিকল্প না থাকায় দেশের অবস্থাপন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে জুনে তাদের রেকর্ড প্রায় ১.৫০ লাখ কোটি টাকা এসডিএফ উইন্ডোতে জমা রেখেছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে এসডিএফ-এ জমা পড়ার পরিমাণ ছিল ৪৪৪ থেকে ৫৭৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে, যা জুনে এসে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
কম সুদের এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফ্লোর সুবিধার ওপর ব্যাংকগুলোর এই অতিমাত্রায় নির্ভরতা প্রমাণ করে যে দেশের মুদ্রাবাজার কতটা বিকৃত হয়ে পড়েছে। অলস টাকা ঘরে ফেলে রাখার চেয়ে অন্তত নিরাপদ রাখার তাগিদে ব্যাংকগুলো কম রিটার্ন পেতেই রাজি আছে, যা প্রমাণ করে যে প্রকৃত অর্থনীতিতে টাকা খাটানোর চেয়ে অলস রাখা সস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৫. আন্তঃব্যাংক তারল্য ও মুদ্রানীতির সঞ্চালনে বড় ধাক্কা

উদ্বৃত্ত তারল্যের এই বিশাল পাহাড় ব্যাংকগুলোর স্থানীয় মুদ্রার দায় ব্যবস্থাপনার হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। সাধারণত ব্যাংকগুলো তিন প্রধান উপায়ের মাধ্যমে তাদের স্বল্পমেয়াদি তারল্য ঘাটতি মেটায়—কল মানি মার্কেট, ইন্টারব্যাংক রেপো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো।
  • ধার নেওয়ার ধরনে পরিবর্তন: এই তিন প্রধান উৎস থেকে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের জুনে ছিল ২.৬৬ লাখ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ২.৯৩ লাখ কোটি এবং চলতি বছরের জুনে ৩.৯৭ লাখ কোটিতে গিয়ে ঠেকে।
  • সাম্প্রতিক পতন: তবে জুনে অতিরিক্ত তারল্য যখন চরমে পৌঁছায়, তখন এই তিন উৎস থেকে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২.৭৮ লাখ কোটি টাকায় নেমে আসে। কারণ, তারল্য-সমৃদ্ধ ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে হয় নিজেদের কাছে ক্যাশ ধরে রেখেছে, না হয় তা সোজা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা করেছে।
আন্তঃব্যাংক তারল্যের এই সুষম বণ্টন ভেঙে পড়ার অর্থ হলো—একদিকে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো বিশাল ক্যাশ পাহাড়ের ওপর বসে আছে, অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে ধুঁকছে। এর ফলে মুদ্রানীতির সঠিক সুফল পুরো অর্থনীতিতে কার্যকর হতে পারছে না।

৬. দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও আশঙ্কা

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকাররা এই তারল্য সংকটের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন:
  • নিট সুদের ব্যবধান (NIM) সংকুচিত হওয়া: ব্যাংকগুলো যখন চড়া সুদে খুচরা আমানত সংগ্রহ করছে (যা ১০.৭৪% আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে), অথচ সেই টাকা উচ্চ সুদে বেসরকারি খাতে খাটাতে পারছে না, তখন তাদের তহবিল সংগ্রহের ব্যয় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।
  • সুদের হার কমানোর চাপ: এই স্থবির অর্থনৈতিক অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা ধরে রাখতে একপর্যায়ে আমানত ও ঋণের সুদের হার কমাতে বাধ্য হবে।
  • আমানতকারীদের প্রকৃত আয় ঋণাত্মক হওয়া: এমন পরিস্থিতিতে যদি আমানতের সুদের হার প্রচলিত মূল্যস্ফীতির হারের নিচে নেমে যায়, তবে সাধারণ আমানতকারীদের প্রকৃত আয় ঋণাত্মক হয়ে পড়বে। এটি দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষকে সঞ্চয় থেকে বিমুখ করবে এবং আনুষ্ঠানিক আর্থিক খাতের ওপর আস্থায় প্রভাব ফেলবে।

নীতিগত কৌশলগত প্রস্তাবনা

এই তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং স্থবির অর্থনীতিতে সুদিন ফেরাতে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ নিতে হবে:
  1. জ্বালানি খাতের সংকট সমাধান: রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জ্বালানি খাতে জরুরি কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে, যাতে থমকে থাকা শিল্পগুলো আবার সচল হতে পারে।
  2. খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তি: পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায় ও নিষ্পত্তির জন্য শক্তিশালী অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (AMC) কাঠামো এবং বিশেষায়িত আর্থিক আদালত কার্যকর করতে হবে, যাতে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও সাহস ফিরে আসে।
  3. টারগেটেড ক্রেডিট গ্যারান্টি: এসএমই (SME) খাত এবং উদীয়মান উৎপাদনশীল খাতগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টি স্কিম চালু করা দরকার, যাতে ব্যাংকগুলো প্রান্তিক ও সম্ভাবনাময় খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ভয় না পায়।
  4. সরকারি সিকিউরিটিজ ইস্যুর ভারসাম্য: বাজার থেকে অতিরিক্ত তারল্য শুষে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বিলের সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঠিক পলিসি সাজাতে হবে, যাতে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার পথ রুদ্ধ না হয়ে যায়।
অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে ৪.১৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর এই রেকর্ড কোনো আর্থিক শক্তির প্রতীক নয়; বরং এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় লাল সংকেত। এটি এমন এক ভঙ্গুর আর্থিক কাঠামোর চিত্র তুলে ধরে, যেখানে মূলধন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়ে কর্মসংস্থান বা জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার বদলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে অলস পড়ে থাকছে।
এই তারল্য সংকট বা প্যারাডক্স দূর করতে হলে কেবল গতানুগতিক মুদ্রানীতির ওপর ভরসা করলে চলবে না। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট এবং পুরোনো খেলাপি ঋণের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান না করে শুধু নীতিগত পরিবর্তন দিয়ে ঝুঁকিপ্রবণ ব্যাংক বা দ্বিধান্বিত উদ্যোক্তাদের মাঠে নামানো সম্ভব নয়। শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট দূর করা, খেলাপি ঋণের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অলস পড়ে থাকা এই মূলধনকে উৎপাদনশীল খাতে পুনর্নির্দেশ করার মাধ্যমেই কেবল এই স্থবিরতার চক্র ভাঙা সম্ভব। আর তবেই এই অলস টাকার পাহাড় পরিণত হতে পারে একটি গতিশীল ও আধুনিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে।
Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর