জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

যন্ত্রাংশের আড়ালে চার বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির চেষ্টা

মোংলা বন্দরে ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে বড় বড় খণ্ডে কেটে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির চালান শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। কাস্টমসের পরীক্ষায় দেখা গেছে, চালানে থাকা অংশগুলো সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। বরং গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো, বৈদ্যুতিক সংযোগ, সংবেদক এবং অন্যান্য অপরিহার্য উপাদানসহ বড় অংশে কেটে সেগুলো দেশে আনা হয়েছে। এসব অংশ পুনরায় সংযোজন করলে সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলোর মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, চালানটি ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যগুলোর ধরন ও বিন্যাস সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং কয়েকটি বড় অংশে কেটে গাড়িগুলোকে আংশিক সংযোজিত অবস্থায় দেশে আনার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা পাওয়া গেছে।

কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে চারটি পৃথক গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো ২০১৭ মডেলের রেঞ্জ রোভার ভোগ, ২০১০ মডেলের বিএমডব্লিউ ৬৫০ আই, ২০১৬ মডেলের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট। কাস্টমসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাংলাদেশি বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।

অথচ চালানটির ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। ঘোষিত তথ্যের ভিত্তিতে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা। এর ওপর শুল্ক-কর বাবদ ৬ লাখ ৭ হাজার ৩৯৬ টাকা এবং অন্যান্য অর্থসহ মোট ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা পরিশোধযোগ্য দেখানো হয়।

চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪। আমদানিকারক ঢাকার গেন্ডারিয়ার ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস। পণ্য খালাসের জন্য নিযুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট খুলনার এসটি ইন্টারন্যাশনাল। চালানটি জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে মোংলা বন্দরে আনা হয়।

ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, চালানে ১৪ ধরনের পণ্যের মোট ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল। এর মধ্যে ব্যবহৃত গাড়ির দরজা, ২ হাজার সিসি পেট্রোল ইঞ্জিনসহ গিয়ার অ্যাসেম্বলি, সাসপেনশন শক অ্যাবজর্বার, নোজ কাট, হেডলাইট, টেইললাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং হুইল ও বাম্পারসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশের উল্লেখ ছিল।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং মোংলা সার্কেল চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে। এরপর ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষায় শুধু কাস্টমস কর্মকর্তারাই ছিলেন না; বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদেরও কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়।

পরীক্ষার সময় গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা স্টিকার, লেবেল, চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, চালানে থাকা অংশগুলো একেবারে বিচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশ নয়।

কোথাও সামনের কাটা অংশের সঙ্গে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ ও সংবেদক অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। কোথাও ছিল সম্পূর্ণ পেছনের কাটা অংশ। আবার কোনো অংশে সামনের ও পেছনের কাঠামো এবং ছাদ কাটা প্যানেল অ্যাসেম্বলি পাওয়া যায়। এসব উপাদানের সঙ্গে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ও কার্যকরী অংশ যুক্ত থাকায় কাস্টমসের সন্দেহ আরও জোরালো হয়।

চারটি গাড়ির সম্ভাব্য মূল্য সম্পর্কে প্রাথমিক হিসাব হলো—

গাড়ির নামমডেল বছরআনুমানিক বাজারমূল্য
রেঞ্জ রোভার ভোগ২০১৭১ কোটি ৬০ লাখ–১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা
বিএমডব্লিউ ৬৫০ আই২০১০৬০–৯০ লাখ টাকা
লেক্সাস এলএক্স৫৭০২০১৬২ কোটি–৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি
টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটউল্লেখিত নয়৩০–৪৫ লাখ টাকা
চার গাড়ির সম্ভাব্য মোট মূল্য৪ কোটি ৫০ লাখ–৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তার বেশি

কাস্টমসের মতে, ব্যবহৃত গাড়ির সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করা হলে বিভিন্ন উপাদান আলাদা ও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার কথা। কিন্তু এই চালানে পাওয়া কাঠামোগুলোতে গাড়ির মূল শরীরের বড় অংশের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সংযোগ, সংবেদক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংযুক্ত ছিল। ফলে পণ্যগুলোকে শুধু আলাদা যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘোষণায় প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ দশমিক ৭৪৩৩ টাকা এবং অন্যান্য ব্যয় ১৯ হাজার ৫৭৭ টাকা ধরে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই হিসাবে শুল্ক-করসহ পরিশোধযোগ্য অর্থ ছিল মাত্র ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা। চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্যের তুলনায় ঘোষিত মূল্য ও পরিশোধযোগ্য শুল্ক-কর অনেক কম হওয়ায় বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে।

তবে এ পর্যায়ে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। কারণ গাড়িগুলোকে কীভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি প্রমাণিত হয় যে এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশ নয়, বরং আংশিক সংযোজিত মোটরযান, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের প্রশ্ন উঠতে পারে।

সেক্ষেত্রে গাড়ির প্রকৃত মূল্য, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, মডেল বছর, বয়স, অবচয় এবং প্রযোজ্য শুল্ক-করসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এরপর নির্ধারণ করা হবে সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের পরিমাণ এবং ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত আমদানিপণ্যের পার্থক্য কতটা।

শুল্ক-শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে কোনো পণ্য অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা খণ্ডিত অবস্থায় থাকলেও তার মধ্যে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা অপরিহার্য চরিত্র বিদ্যমান থাকে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসের সুযোগ রয়েছে। এই চালানে পাওয়া অংশগুলোর ধরন, সংযোগ ও বিন্যাস পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চারটি গাড়ির ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ মোটরযানের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

ফলে ঘটনাটি শুধু ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির অনিয়ম হিসেবে দেখা হচ্ছে না। পণ্যের প্রকৃত পরিচয়, আমদানির ধরন, শুল্ক-শ্রেণিবিন্যাস এবং ঘোষিত মূল্যের যথার্থতা—সবকিছুই এখন যাচাইয়ের আওতায়। চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে, এসব গাড়ির ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কত শুল্ক-কর প্রযোজ্য এবং ঘোষিত তথ্যের সঙ্গে তার কতটা পার্থক্য রয়েছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর