আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘যোগ্য’ পুলিশ সুপার (এসপি) বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ সদরদপ্তর। এই প্রক্রিয়ার আওতায় বর্তমানে ৬৪ জেলায় যারা পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের যোগ্যতার মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। রেঞ্জ ডিআইজিদের মাধ্যমে এই মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে।
এসপি পদে থাকা কর্মকর্তাদের বাইরে, পুলিশের অন্যান্য ইউনিটে কর্মরত একই পদমর্যাদার যোগ্য কর্মকর্তাদের তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। তাদের সবাইকে নিয়ে তিনটি পৃথক পুল গঠন করা হচ্ছে। এসব পুল থেকে নির্বাচনকালীন সময়ে পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই যোগ্যতা বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে পুলিশের মধ্যে কিছু সংশয় রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এ প্রক্রিয়ায় সঠিক কর্মকর্তা নির্বাচন করা যাবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।
নির্বাচন ঘিরে গত দুই দিনে ২৯ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) বদল করা হয়েছে এবং শিগগিরই পুলিশ সুপার পদেও রদবদল আসবে, এমন খবর পাওয়া গেছে।
পুলিশ সুপার বাছাইয়ের জন্য যে পুল তৈরি হচ্ছে, তা যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে। এসব মানদণ্ডের মধ্যে সততা, কাজের যোগ্যতা, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম সমকালকে জানিয়েছেন, “এসপিরা কীভাবে কাজ করছেন, সে বিষয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং একটি পুল তৈরি হচ্ছে। পুল থেকে যোগ্যদের পদায়ন করা হবে। কেউ কেউ অযোগ্য হতে পারেন, আবার কেউ কেউ মাঠে এসপির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন, সেক্ষেত্রে পুল থেকে অন্যদের বিবেচনায় নেওয়া হবে।”
এছাড়া, এসপি পদায়ন সম্পর্কে বাহারুল আলম বলেন, “আমাদের কাছে অনেক টুলস রয়েছে। আমরা অনেকজনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের যোগ্যতা মূল্যায়ন করি, যেমন ব্যবসায়ী, মামলার বাদী, রাজনৈতিক নেতা ইত্যাদি।”
এদিকে, মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে এসপি পদায়ন করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে কীভাবে লটারি করা হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
নির্বাচন আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে, এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে।
পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ৬৪ জেলার এসপির যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং তিনটি ভাগে (এ, বি, সি) শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। এসব ক্যাটেগরির ভিত্তিতে এসপির পদায়ন করা হবে।
বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা এসপির বেশিরভাগই বিসিএস ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তা, বাকিরা ২৭ ব্যাচের। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার আগেই কিছু জেলার এসপির মধ্যে রদবদল হবে, এবং নির্বাচনকালীন সময়ে পুলিশের মাঠ প্রশাসনে বড় পরিবর্তন আসবে।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসপি ও পুলিশের পদায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চলমান কার্যক্রম নিয়ে তারা বৈঠক করবেন এবং পুলিশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের মতামত পৌঁছানো হবে।
কিছু পুলিশ কর্মকর্তার মতে, ডিআইজিদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিখুঁত নাও হতে পারে। যদি কোনো এসপির সঙ্গে ডিআইজির সুসম্পর্ক থাকে, তবে তার মূল্যায়ন সঠিক না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে, ডিআইজির সঙ্গে এসপির মতবিরোধ থাকতে পারে, ফলে মূল্যায়ন নিরপেক্ষ না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু ডিআইজি নয়, অন্যান্য মাধ্যম থেকেও এসপিদের বিষয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।
পুলিশের নীতিনির্ধারকরা বলেন, তারা নির্বাচনকে ঘিরে অতীতের বিতর্কিত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি পেতে চান। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া তিনটি নির্বাচন ছিল বিতর্কিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট, যেখানে প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একতরফা কাজ করার অভিযোগ ছিল।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এসপি ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য ‘ফিটলিস্ট’ বা বাছাই তালিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়, যেখানে সততা ও নিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
