গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকটে দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্পে উৎপাদন কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় ধাতু গলানো, ঢালাই ও তাপ প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে যন্ত্রপাতি নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি বাড়ছে জ্বালানি, পরিচালনা ও উৎপাদন ব্যয়। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে আগে থেকেই চাপে থাকা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পানির কল তৈরি করে ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানটি সাম্প্রতিক কয়েক মাসে গ্যাসসংকটের কারণে বড় সমস্যায় পড়েছে। কারখানায় পিতল গলানোর জন্য গ্যাসচালিত চুলা নিয়মিত চালু রাখা প্রয়োজন। কিন্তু গত চার থেকে পাঁচ মাস ধরে গ্যাসের চাপ ক্রমাগত কমেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সোলায়মান পারসীর ভাষ্য অনুযায়ী, এখন দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ কারখানা চালু রাখতেই প্রতিদিন প্রায় ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়। এই ব্যয় সামাল দিতে দৈনিক ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন প্রয়োজন হলেও গ্যাসসংকটের কারণে উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায়। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি প্রতিদিনই লোকসানের চাপ বাড়ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। এক বছর আগে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩০ জন কর্মী থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ১২ জনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন কমে গেলে শ্রমিকের প্রয়োজনও কমে যায়—কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব স্থানীয় আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকাতেই পানির কল তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সাড়ে তিন শ ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকের নিজস্ব পিতল গলানোর ব্যবস্থা থাকলেও ছোট উদ্যোক্তারা সাধারণত অন্য কারখানার কাস্টিং সুবিধার ওপর নির্ভর করেন। ফলে একটি কারখানায় গ্যাসসংকট দেখা দিলে তার প্রভাব কাঁচামাল প্রস্তুতকারী, ঢালাইকারী, যন্ত্রাংশ নির্মাতা এবং শেষ পর্যায়ের পণ্য উৎপাদনকারী—সব পক্ষের ওপরই পড়ে।
দেশের অন্যান্য হালকা প্রকৌশল শিল্পাঞ্চলেও একই ধরনের সংকটের কথা জানাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার হালকা প্রকৌশল কারখানা রয়েছে। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। কৃষি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, ছাঁচ, ধাতব সামগ্রী, পানির কলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনে এসব কারখানার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনাসহ বিভিন্ন শিল্পক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের মতে, কিছু এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ধাতু গলানো থেকে শুরু করে কাস্টিং ও তাপ প্রয়োগের কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদনের পরিমাণ কমছে, আবার নির্ধারিত সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে উঠছে।
গাজীপুরের শালনায় কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করে অ্যাগ্রো মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শেখ সাদী জানান, তাঁদের কারখানায় দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। প্রতিবার বিদ্যুৎ ফিরে আসতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। এতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে যে কাজ আধা ঘণ্টায় শেষ করা সম্ভব, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেটিতে অনেক বেশি সময় লাগছে। এর ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমেছে এবং সময়মতো ক্রেতাদের অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর ব্যবহার করাও অনেক উদ্যোক্তার জন্য স্থায়ী সমাধান হয়ে উঠছে না। কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক ছাঁচ তৈরির প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুল ইসলাম জানান, তাঁদের জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছে। গত এক মাসে জেনারেটর পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিল ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
সংকটের প্রভাব একাধিক স্তরে
| বিষয় | বর্তমান পরিস্থিতি |
|---|---|
| দেশে হালকা প্রকৌশল কারখানা | প্রায় ৫০ হাজার |
| খাতটির সঙ্গে যুক্ত মানুষ | প্রায় সাড়ে ছয় লাখ |
| যাত্রাবাড়ীতে কল তৈরির কারখানা | প্রায় সাড়ে তিন শ |
| ফয়সল পলিমারের দৈনিক কারখানা পরিচালনা ব্যয় | প্রায় ১৮ হাজার টাকা |
| ফয়সল পলিমারের প্রয়োজনীয় দৈনিক উৎপাদন | প্রায় ৭–৮ লাখ টাকা |
| ফয়সল পলিমারের বর্তমান দৈনিক উৎপাদন | প্রায় ৩–৪ লাখ টাকা |
| ফয়সল পলিমারের আগের কর্মী | ৩০ জন |
| ফয়সল পলিমারের বর্তমান কর্মী | ১২ জন |
| অ্যাগ্রো মেশিনারিতে দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট | ৪–৫ বার |
| অ্যাগ্রো মেশিনারিতে উৎপাদন | স্বাভাবিক সময়ের অর্ধেকের নিচে |
| ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দৈনিক জেনারেটর জ্বালানি | প্রায় ২০০ লিটার |
| জেনারেটর পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি | প্রায় ৪০ শতাংশ |
| বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি | ৩০ শতাংশের বেশি |
| ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উৎপাদন হ্রাস | প্রায় ৩০ শতাংশ |
সংকটের আরেকটি দিক হলো—উৎপাদন কমলেও কারখানার অনেক স্থায়ী ব্যয় কমছে না। কারখানার ভাড়া, কর্মীদের বেতন, ঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নির্দিষ্ট সময়েই পরিশোধ করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জেনারেটরের জ্বালানি, বিদ্যুৎ বিল এবং বারবার উৎপাদন বন্ধ ও চালুর অতিরিক্ত খরচ। ফলে একদিকে বিক্রি ও উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
এর সঙ্গে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্যোক্তাদের চাপ বাড়াচ্ছে। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের হাতে বড় প্রতিষ্ঠানের মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থের মজুত না থাকায় দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে তাদের আর্থিক সংকট দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে। কর্মীদের বেতন-ভাতা, কাঁচামাল কেনা এবং ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ—সবই তখন কঠিন হয়ে পড়ে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, উদ্যোক্তারা নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাঁদের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার পাওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। সংকট দীর্ঘ হলে ঋণের কিস্তি পরিশোধেও সমস্যার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়গুলো সরকারকে জানানো হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হালকা প্রকৌশল শিল্পকে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কৃষি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও ছাঁচ তৈরিতে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে। ফলে কোনো একটি শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট অন্য খাতেও পৌঁছাতে পারে।
উদ্যোক্তাদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রথমেই প্রয়োজন শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা না গেলে অর্ডার হারানো, বাড়তি ব্যয়, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধের চাপ—সবকিছু মিলিয়ে ছোট কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব দেশের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা ও শিল্প সরবরাহব্যবস্থার ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।









