রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার কোটি মানুষের সুপেয় পানি সরবরাহ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা এখন অভূতপূর্ব এক প্রশাসনিক অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে সংস্থাটিতে বারবার শীর্ষ নেতৃত্ব বদল হওয়ায় সেবা সংস্থাটির গতি থমকে গেছে। একের পর এক পদত্যাগ, নতুন নিয়োগ ও আইনি জটিলতার কারণে এই স্বল্প সময়ে সাতজন কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) চেয়ারে বসেছেন। ফলে ঢাকার পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর নাগরিক পরিষেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগে সংযুক্ত অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুজ্জামানকে ঢাকা ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট (মঙ্গলবার) এই সংক্রান্ত নির্দেশ জারির মাধ্যমে ওয়াসার এমডি পদে নতুন একজন কর্মকর্তা যুক্ত হলেন। ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছর ওয়াসার এমডি পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আলোচিত-সমালোচিত কর্মকর্তা প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ১৪ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ওয়াসার জ্যেষ্ঠতম উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সহিদ উদ্দিন দায়িত্ব নিলেও সেই নিয়োগের আইনি বৈধতা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন সংশ্লিষ্টরা।
পরবর্তী সময়ে ওয়াসার শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে ঘনঘন পরিবর্তন আসতে থাকে। তাকসিম এ খানের পর মো. শাহজাহান মিয়া অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান হিসেবে ওয়াসার হাল ধরেন এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কাজ করেন। এরপর মো. আব্দুস সালাম ব্যাপারী নিয়মিত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পেলেও নানা বিতর্কের মধ্যে মাত্র চার মাসের মাথায় ২০২৬ সালের ৮ মার্চ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আব্দুস সালামের বিদায়ের পর স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুহা. মনিরুজ্জামান মাত্র এক দিনের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলান। এরপর ১০ মার্চ মো. আমিনুল ইসলামকে এক বছরের প্রেষণে নিয়মিত এমডি করা হলেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই তাঁকে অন্য দপ্তরে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর বাইরে বিভিন্ন সময় শূন্যতা পূরণে স্থানীয় সরকার বিভাগ বা তৎকালীন প্রশাসকদের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। অবশেষে ২৫ আগস্ট প্রেষণে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পেলেন নতুন এমডি ড. মো. মনিরুজ্জামান।
সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, শীর্ষ প্রশাসনিক পদে এই ধরনের বারবার রদবদলের কারণে নীতিগত সিদ্ধান্তে চরম স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবার নতুন এমডি দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়াসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিশাল সব প্রকল্প বুঝে উঠতেই কয়েক মাস পার হয়ে যায়। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগেই আবারও নেতৃত্ব বদলে যাচ্ছে। এতে সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানগুলোর বাস্তবায়ন কাজ পিছিয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনিক এই বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতার চড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকার অভিযোগ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টির মৌসুমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশায় সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ঢাকা ওয়াসার নতুন প্রধান মো. মনিরুজ্জামানের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ওয়াসার ভঙ্গুর প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং স্থবির হয়ে থাকা নাগরিক সেবাগুলোকে দ্রুত সচল করা।








