ঝালকাঠির রাজাপুরে দাফতরিক কোনো ধরনের অনুমতি বা বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা না করেই একটি জনগুরুত্বপূর্ণ আয়রন ব্রিজের লোহার মালামাল খুলে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে। সেতুটি হঠাৎ ভেঙে ফেলায় আশপাশের প্রায় চার গ্রামের কয়েক শ মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।
গত শুক্রবার উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর তারাবুনিয়া এলাকায় এদবর খালের ওপর এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম মামুন আকন, যিনি সাতুরিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
Table of Contents
স্থানীয়দের বাধা ও মালামাল জিম্মায় নেওয়া
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই খালের ওপর থাকা ওই পুরোনো সেতুটি ব্যবহার করে স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের মানুষ নিয়মিত চলাচল করে আসছিলেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রতিদিন এই পথটি ব্যবহার করতেন। সেতুটির কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে সুপারি গাছ দিয়ে পারাপারের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেতুটি এলাকার মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল।
কোনো ধরনের বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা না করে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই মামুন আকন গোপনে ব্রিজের মূল বীম ও লোহার মালামাল তুলে নিতে শুরু করেন। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয়রা বাধা দেন। পরে স্থানীয় প্রকৌশল ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অফিসে খবর দেওয়া হলে সেখান থেকে লোকজন এসে মালামালের জব্দ তালিকা বা সিজার লিস্ট তৈরি করেন। পরবর্তীতে উদ্ধার করা সেই সমস্ত লোহালক্কড় স্থানীয় গ্রাম পুলিশ হেমায়েতের জিম্মায় রাখা হয়।
অভিযুক্ত নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য
নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মামুন আকন দাবি করেন যে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্যের মৌখিক অনুমতি নিয়েই খালের ওপর থেকে ব্রিজের মালামাল তুলেছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে যে, জনগণের চলাচলের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে তিনি কীভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরকারি স্থাপনার মালামাল সরাতে পারেন।
এ বিষয়ে সাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাঈনুল হায়দার নিপু স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি কাউকে ওই ব্রিজের বীম বা মালামাল তুলে নেওয়ার কোনো অনুমতি দেননি। তাঁর মতে, সরকারি কোনো স্থাপনার মালামাল সরাতে হলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিষদে রেজুলেশন করতে হয় এবং জনগণের চলাচলের জন্য বিকল্প পথ বা নতুন সেতু নিশ্চিত করার পরই কেবল এমন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। এই ঘটনার সঙ্গে পরিষদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান তিনি।
এদিকে রাজাপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রতন দেবনাথ বলেছেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ। দলীয় শৃঙ্খলাবহির্ভূত এমন কর্মকাণ্ড দল কখনই সমর্থন করে না এবং এটি ওই নেতার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধ প্রমাণিত হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও এলাকাবসীর দাবি
ঘটনার বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী এস এম জিয়াউল হক জানান, মালামাল সরানোর আগে তাদের কোনো ধরনের অনুমতি নেওয়া হয়নি। খবর পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে লোক পাঠিয়ে সিজার লিস্ট তৈরি করা হয়েছে এবং মালামালগুলো চৌকিদারের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যসমূহ
| ক্রমিক | তথ্যের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট বিষয় ও তথ্যসূত্র |
| ১ | ঘটনার স্থান | উত্তর তারাবুনিয়া, সাতুরিয়া ইউনিয়ন, রাজাপুর, ঝালকাঠী |
| ২ | সংস্থাপনা | এদবর খালের ওপর অবস্থিত পুরোনো আয়রন ব্রিজ |
| ৩ | অভিযুক্ত ব্যক্তি | মামুন আকন (সাধারণ সম্পাদক, সাতুরিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল) |
| ৪ | ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা | আশপাশের প্রায় ৪টি গ্রাম |
| ৫ | দুর্গারে পড়া মানুষ | কয়েক শ সাধারণ পথচারী ও এলাকাবাসী |
| ৬ | ইউপি চেয়ারম্যান | সৈয়দ মাঈনুল হায়দার নিপু |
| ৭ | উপজেলা প্রকৌশলী | এস এম জিয়াউল হক (এলজিইডি) |
| ৮ | উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা | রিফাত আরা মৌরি |
| ৯ | স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা | রতন দেবনাথ (উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি) |
| ১০ | দ্রুত দাবি | অবিলম্বে বিকল্প পারাপার বা সেতু পুনঃস্থাপন |
জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ওই স্থানে জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। অননুমোদিতভাবে সরকারি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণের পেছনে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেছেন তারা।









