জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

কনসার্ট বাতিলে সংস্কৃতির স্বাধীনতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে দুই দিনের ব্যবধানে দুটি কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনুষ্ঠান আয়োজনের স্বাধীনতা, শিল্পী ও আয়োজকদের নিরাপত্তা, প্রশাসনের ভূমিকা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ—এসব বিষয় সামনে এনে প্রশ্ন তুলছেন সংগীতশিল্পী, সুরকার ও আয়োজকেরা।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে আগেই আয়োজকদের জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে শেষ মুহূর্তে আয়োজন বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা বাড়লে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে। এতে শুধু শিল্পীদের কাজ ব্যাহত হবে না, একটি অনুষ্ঠান ঘিরে যুক্ত থাকা বহু মানুষের জীবিকা ও বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

একটি কনসার্ট আয়োজনের পেছনে শিল্পী ছাড়াও যন্ত্রশিল্পী, শব্দ ও আলোকসজ্জাকর্মী, মঞ্চকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, আয়োজক, প্রচারকর্মীসহ অনেক মানুষ যুক্ত থাকেন। অনুষ্ঠানের জন্য আগেই মঞ্চ তৈরি, সরঞ্জাম ভাড়া, প্রচার, পরিবহন ও অন্যান্য খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়। ফলে আয়োজন শেষ মুহূর্তে বাতিল হলে ক্ষতির প্রভাবও ছড়িয়ে পড়ে সংশ্লিষ্ট অনেকের ওপর।

প্রবীণ সুরকার ও সংগীতজ্ঞ শেখ সাদী খান মনে করেন, সংস্কৃতিকে কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা বিশেষ মহলের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। তাঁর মতে, একটি দেশের পরিচয় ও সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ভাষা, গান, সাহিত্য, নাটক, লোকসংগীত ও বিভিন্ন শিল্পচর্চার মধ্য দিয়েই একটি জাতির দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংগীতের জন্য পরিচিত একটি অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁর বক্তব্য, কোনো অনুষ্ঠানের শব্দ নিয়ে আপত্তি থাকলে শব্দের মাত্রা কমানো, সময় পরিবর্তন বা অন্য কোনো সমন্বয়ের পথ খোঁজা যেতে পারে। সমস্যা থাকলে তার সমাধান করতে হবে; সংস্কৃতির পথ বন্ধ করে দেওয়া সমাধান হতে পারে না।

শেখ সাদী খান সরকারের প্রতি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশের মানুষকে স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন যে সাংস্কৃতিক চর্চা সবার অধিকার এবং আইন মেনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছামতো বাধা দিতে পারবে না। কেউ আইন ভঙ্গ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন অবস্থান রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিষ্কার হওয়া দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

তাঁর বক্তব্যে রাজনীতি ও সংস্কৃতির সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে। শেখ সাদী খানের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু দেশের সংস্কৃতি ও মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে একটি অভিন্ন জায়গায় দাঁড়াতে হবে। সাংস্কৃতিক পরিসর দুর্বল হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু শিল্পীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সমাজের সামগ্রিক পরিবেশেও এর প্রতিফলন ঘটতে পারে।

প্রবীণ সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনও কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁর প্রধান উদ্বেগ শিল্পী ও আয়োজকদের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে। তাঁর মতে, কারও কোনো গান বা অনুষ্ঠান ভালো না লাগতেই পারে। সেটি না দেখা বা না শোনার স্বাধীনতা তাঁর রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

সাবিনা ইয়াসমীনের মতে, কোনো সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের একটি আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা অনুষ্ঠানের আগেই জানানো উচিত। তখন আয়োজকেরা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে পারেন অথবা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর অনুষ্ঠান বাতিল করা হলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

তিনি আরও বলেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে অবশ্যই শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও নিয়ম মানা প্রয়োজন। কোনো আয়োজনে অনিয়ম থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু গানবাজনা বা কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়াকে সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং আইন মেনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সাবিনা ইয়াসমীনের আশঙ্কা, বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে শিল্পীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। শিল্পীরা কোনো অনুষ্ঠানের জন্য দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নেন, সময় দেন এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য কাজের সুযোগও ছেড়ে দেন। শেষ মুহূর্তে আয়োজন বাতিল হলে তার আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পেশাগত হতাশাও তৈরি হয়।

সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড তারকা হামিন আহমেদ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তাঁর মতে, কোনো অনুষ্ঠান বাতিলের সময় শেষ মুহূর্তে নিবন্ধন বা প্রশাসনিক কোনো কারণ সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। তাঁর দৃষ্টিতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার আগের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে একই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটার সুযোগ তৈরি হয়।

হামিন আহমেদ অতীতের কিছু ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিল্পীদের হয়রানি ও অপমানের ঘটনাও ঘটেছে। তাঁর মতে, এসব ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বাধাদানকারীরা নিজেদের আরও প্রভাবশালী মনে করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা বাড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

তবে কনসার্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে শিল্পীদেরও দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয়, শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয় এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ থাকে—এসব বিষয় আয়োজকদেরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তখনই সফলভাবে সম্পন্ন হতে পারে, যখন শিল্পী, দর্শক, আয়োজক ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় থাকে।

বিশেষ করে শব্দদূষণ, যানজট, নিরাপত্তা, অনুষ্ঠানস্থলের অনুমতি কিংবা সময়সীমা নিয়ে আপত্তি থাকলে আগেই তা সমাধান করা সম্ভব। প্রশাসন যদি নির্দিষ্ট নিয়ম ও নির্দেশনা আগে থেকে জানিয়ে দেয়, তাহলে আয়োজকেরাও সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এতে শেষ মুহূর্তে উত্তেজনা বা অনুষ্ঠান বাতিলের মতো পরিস্থিতি এড়ানোর সুযোগ বাড়বে।

শিল্পীদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—তাঁরা নিয়মহীন সাংস্কৃতিক আয়োজনের পক্ষে নন। তাঁদের দাবি হলো, আইন ও বিধি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হোক। কোনো আয়োজন সত্যিই নিয়মবহির্ভূত হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, সামাজিক চাপ কিংবা কোনো গোষ্ঠীর আপত্তিকে যেন অনুষ্ঠান বন্ধের একমাত্র কারণ হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।

কনসার্ট শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, এর সঙ্গে একটি বড় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিসরও জড়িত। একজন শিল্পীর মঞ্চে ওঠার আগে অনেক মানুষের শ্রম থাকে। দর্শকের টিকিট কেনা থেকে শুরু করে মঞ্চ নির্মাণ, শব্দব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, পরিবহন ও নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে একটি অনুষ্ঠান স্থানীয় অর্থনীতিতেও কিছুটা প্রভাব ফেলে। তাই একটি আয়োজন বাতিল হওয়ার অর্থ কেবল একটি সন্ধ্যার বিনোদন নষ্ট হওয়া নয়; এর সঙ্গে বহু মানুষের পরিকল্পনা ও শ্রমও ব্যর্থ হয়ে যায়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শিল্পীদের কাছে শুধু দুটি কনসার্ট বাতিলের বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের মতে, মতপার্থক্য থাকলে আলোচনা হতে পারে, আপত্তি থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাধা ও ভয় যেন সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাভাবিক অংশ হয়ে না দাঁড়ায়।

শিল্পীদের প্রত্যাশা, সরকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি উঠলে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহু বছরের। সেই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে যেমন শিল্পীদের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি প্রশাসন ও সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা আছে। মতের ভিন্নতা থাকবে, পছন্দের পার্থক্যও থাকবে। কিন্তু সেই পার্থক্য যেন গান, শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চার পথ বন্ধ করার কারণ না হয়—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর শিল্পীদের বক্তব্যে মূলত সেই বার্তাই উঠে এসেছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর