সিলেট নগরের রায়নগরের চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। আগের জল্পনা-কল্পনা কিংবা প্রাথমিক ধারণার মতো প্রেম বা অনৈতিক সম্পর্কের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। মূলত বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি করতে ঢোকা এবং গৃহকর্মীর কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার কারণেই একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামি বাবুল মিয়া পুলিশি রিমান্ড ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজেই এই মর্মান্তিক ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ঘাতক বাবুল নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চার দিনের রিমান্ড শেষে আসামি আদালতে বিচারকের কাছে দোষ স্বীকার করে বিস্তারিত জবানবন্দি দেওয়ায় শুনানি শেষে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুলিশের তদন্ত ও আসামির জবানবন্দি সূত্রে জানা যায়, বকেয়া বাসা ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বাড়ির মালিক বাবুলকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার চূড়ান্ত চাপ দিচ্ছিলেন। টাকার কোনো উপায় না পেয়ে তিনি পরিচিত ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তারের বাসা ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় চুরির সিদ্ধান্ত নেন। সিসিটিভি ক্যামেরা এড়াতে গত ১২ আগস্ট সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে বাড়ির বারান্দা দিয়ে ভেতরে ঢোকেন বাবুল। ঘরে ঢুকেই তিনি মুখোমুখি হয়ে যান গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগমের। চুরির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়ে বাবুল তাহমিনাকে ধরে ফেলেন এবং সঙ্গে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
তাহমিনার চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম। তিনি ধস্তাধস্তির চেষ্টা করলে বাবুল তাকেও নির্মমভাবে গলায় ও শরীরে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন। এরপর চিৎকার শুনে প্রবীণ গৃহকর্তা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও একইভাবে আঘাত করে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনটি খুন শেষ করে রক্তমাখা শরীর বাথরুমে গিয়ে ধুয়ে নেন বাবুল। এরপর ঘরের ক্যাশবাক্স থেকে ১৫ হাজার টাকা পকেটে পুরেন। তবে দরজার বাইরে মানুষের কণ্ঠ এবং ঘরের ফোন বেজে উঠলে তিনি আর বেশি সময় নষ্ট না করে ওই বারান্দা দিয়েই দ্রুত কেটে পড়েন।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ও মহানগর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক উপদেষ্টা ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগম (২৫)। ঘটনার দিন বিকেলেই রাজবাড়ী এলাকার এক কলোনি থেকে বাবুলকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যে উদ্ধার করা হয় রক্তমাখা ছুরিটি। নিহত দম্পতির প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানান, জবানবন্দির মধ্য দিয়ে এই নৃশংস ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য সত্য উন্মোচিত হয়েছে।









