গ্যাসের সংকট এখন আর সাময়িক জ্বালানি সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের শিল্প খাতের উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, ময়মনসিংহের ভালুকা ও গাজীপুরের শ্রীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে, গ্যাসনির্ভর বহু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কোথাও স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন নেমে এসেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশে, আবার কোথাও ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কিছু কারখানায় মেশিন চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাসই মিলছে না।
যেসব কারখানায় সাধারণত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেশিনের শব্দ, শ্রমিকদের ব্যস্ততা ও উৎপাদনের কর্মচাঞ্চল্য থাকে, সেসব জায়গায় এখন অনেক সময় নীরবতা দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকেরা কারখানায় এসে কাজ না করে অপেক্ষা করছেন, কেউ কেউ ছুটিতে যাচ্ছেন। কোথাও আবার উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে উৎপাদন ও রপ্তানির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ কারখানায় উৎপাদন না হলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য নিয়মিত ব্যয় চালিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘদিন লোকসান চলতে থাকলে জনবল কমানো কিংবা কারখানা বন্ধের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
Table of Contents
- এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে অস্থিরতা
- নরসিংদীতে থেমে যাচ্ছে শিল্পের চাকা
- ১০ ইউনিটের সাতটিই বন্ধ
- আশুলিয়ায় উৎপাদন কমেছে ব্যাপকভাবে
- নারায়ণগঞ্জে ডাইং ও ফিনিশিং কার্যত অচল
- গাজীপুরে উৎপাদন নেমেছে এক-চতুর্থাংশে
- পোশাকশিল্পের আগের ধাপেই বড় ঝুঁকি
- সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান
- উদ্যোক্তাদের তিন ধরনের চাপ
- গ্যাস সংকট বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যয়ও
- পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে কমছে উৎপাদন
- প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সরবরাহ
- দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে অনুসন্ধান বাড়ানোর তাগিদ
- কারখানার চাকা কত দিন থেমে থাকবে?
এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে অস্থিরতা
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের একটি ভাসমান টার্মিনালে দুর্ঘটনা ও কারিগরি সমস্যার পর প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মাঝখানে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতি স্থায়ী হয়নি।
সামিট পরিচালিত গ্যাস টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। পরে আবার তা কমতে শুরু করে। সর্বশেষ কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শিল্পাঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও এই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকে। সংকটের সময় ঘাটতি আরও বাড়ায় শিল্প, বিদ্যুৎ, সার, সিএনজি ও আবাসিক খাতের মধ্যে সীমিত গ্যাস বণ্টন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত কয়েক দিনে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ একসময় ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়। পরে তা ২৪৪ কোটি ঘনফুটে উঠলেও আবার প্রায় ২১৮ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান এখনো বড়।
সীমিত গ্যাসের মধ্যে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে শিল্পকারখানায় সরবরাহ আরও কমে যাচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
নরসিংদীতে থেমে যাচ্ছে শিল্পের চাকা
নরসিংদীর সদর, মাধবদী, চৌয়ালা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সংকটের চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে চার হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক খাতের। প্রায় ৪০০ কারখানা সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
উদ্যোক্তাদের হিসাবে, সাম্প্রতিক সংকটে নরসিংদীতে প্রতিদিন কয়েকশ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। কোথাও তা নেমে এসেছে মাত্র ১০ শতাংশে।
কয়েকটি কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করে বয়লার চালানোর চেষ্টা করছে। এতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়া ঠেকানো গেলেও ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। একটি কারখানায় প্রতিদিন কাঠের পেছনেই ১০ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
চৌয়ালা শিল্প এলাকার একটি কারখানায় শ্রমিকদের বয়লারে কাঠ পোড়াতে দেখা গেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস ছাড়া সাইজিং ও ডাইং কারখানা স্বাভাবিকভাবে চালানো প্রায় অসম্ভব। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন ধরে রাখলেও তা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই নয়।
১০ ইউনিটের সাতটিই বন্ধ
চৌয়ালার মোমিন টেক্সটাইল মিলের ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটি গ্যাসের সংকটে বন্ধ রয়েছে। কারখানাটির স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের তুলনায় বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেকেরও কম।
কারখানাটির দৈনিক ২৫ লাখ গজ কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র কয়েক হাজার গজে। প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার এখন কার্যত কর্মহীন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হচ্ছে। কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকে।
আশুলিয়ায় উৎপাদন কমেছে ব্যাপকভাবে
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাঠগড়া-আমতলা এলাকার ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের একটি কারখানা কয়েক সপ্তাহ কম সক্ষমতায় চলার পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ হাজার পিস। গ্যাস সংকটের পর বাইরে থেকে গ্যাস এনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। ৮০ থেকে ৯০টি মেশিনের মধ্যে প্রায় ২৪টি বন্ধ রাখতে হয়েছে।
স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য কারখানাটিতে প্রায় ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে চাপ শূন্য থেকে ২ দশমিক ৫ পিএসআইয়ের মধ্যে ওঠানামা করছে। কখনো সামান্য চাপ পাওয়া গেলেও তা দিয়ে মেশিন সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
বাইরে থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করলেও প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। আশুলিয়ার আরেকটি টেক্সটাইল কারখানা প্রায় ১৫ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ। উদ্যোক্তার হিসাবে, এতে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকা করে লোকসান হচ্ছে।
আরেকটি ডাইং কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানে প্রায় ৯৭৫ শ্রমিক কর্মরত। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন দিতে হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের জন্য এটিই বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে ডাইং ও ফিনিশিং কার্যত অচল
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও বিসিক শিল্প এলাকার চিত্রও প্রায় একই। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ফিনিশিং ও টেক্সটাইল কারখানার বড় অংশ স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে পারছে না।
কোথাও গ্যাসের চাপ এক থেকে দেড় পিএসআইয়ের মধ্যে রয়েছে। অথচ স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন অনেক বেশি চাপ। ফলে বড় মেশিন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
কারখানার ভেতরে কাপড় পড়ে থাকলেও উৎপাদন নেই। কোথাও শ্রমিকেরা হাজিরা দিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন। কোথাও কারখানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ করিয়ে শ্রমিকদের কর্মস্থলে রাখার চেষ্টা চলছে।
নারায়ণগঞ্জের নিট ডাইং শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠনের হিসাবে, অন্তত ১৫২টি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে একটি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার তথ্যও দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এর প্রভাব তৈরি পোশাক খাতেও পড়তে পারে। কারণ ডাইং ও ফিনিশিং কারখানা থেকে সময়মতো কাপড় না এলে পোশাক কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হয়।
গাজীপুরে উৎপাদন নেমেছে এক-চতুর্থাংশে
গাজীপুরের মাওনা এলাকার আর্টিসান সিরামিকসের কারখানায় গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ২৫ শতাংশে। দৈনিক ২২ হাজার পিস তৈজসপত্র উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ছয় হাজার পিস।
সিরামিক পণ্য তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এ ধরনের পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এখানেই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। উৎপাদন কমে গেলে ক্রেতাকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়। সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতা অন্য দেশ থেকে পণ্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আন্তর্জাতিক বাজারে হারানো ক্রয়াদেশ ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস সংকট এখন আর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সমস্যা নেই; এটি শিল্পের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, ডাইং, নিটিং ও ফিনিশিংসহ গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সংকট দীর্ঘ হলে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ধরে রাখার সক্ষমতা হারাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাসের চাপ কখন থাকবে আর কখন থাকবে না—এ বিষয়ে নিশ্চয়তা না থাকায় উদ্যোক্তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব রপ্তানিতেও পড়ছে।
পোশাকশিল্পের আগের ধাপেই বড় ঝুঁকি
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব তৈরি পোশাক কারখানার তুলনায় সুতা, কাপড়, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানায় বেশি। এসব শিল্পের উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় বয়লার, বাষ্প ও তাপভিত্তিক বিভিন্ন কাজের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস প্রয়োজন।
একটি পোশাক কারখানা সীমিত গ্যাস বা বিকল্প জ্বালানি দিয়ে কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে নিতে পারলেও ডাইং, ফিনিশিং কিংবা কাপড় তৈরির কারখানায় একইভাবে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন। ফলে গ্যাস সংকট সরবরাহব্যবস্থার শুরুতেই বাধা তৈরি করছে।
সুতা উৎপাদন কমে গেলে কাপড় তৈরিতে সমস্যা হয়। কাপড় না থাকলে ডাইং ও ফিনিশিং ব্যাহত হয়। আর এসব ধাপ সময়মতো শেষ না হলে পোশাক কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি সময়সূচিও বিঘ্নিত হয়।
ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোক্তা সময়মতো পণ্য পাঠাতে বাড়তি খরচ করে আকাশপথে পণ্য পাঠানোর চেষ্টা করছেন। কোথাও ক্রেতাকে মূল্যছাড় দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট একটি কারখানার উৎপাদন ক্ষতির বাইরে গিয়ে পুরো সরবরাহব্যবস্থা ও রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান
গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারখানা বন্ধ থাকলে অনির্দিষ্টকাল শ্রমিককে বেতন দেওয়া উদ্যোক্তাদের পক্ষে কঠিন। উৎপাদন কমলে শিফট কমানো হয়, এরপর ছুটিতে পাঠানো কিংবা অস্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান কমানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সংকট দীর্ঘ হলে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও বাড়ে।
নরসিংদীর একটি কারখানায় প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে দেড় হাজার কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আশুলিয়ার একটি স্পিনিং মিলে উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অন্তত ৩০ শতাংশ জনবল কমানো ছাড়া উপায় থাকবে না। অন্য কারখানায় শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর প্রভাব শুধু কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পাঞ্চলের পরিবহন, খাবারের দোকান, বাসাবাড়ি ভাড়া, স্থানীয় বাজার এবং ছোট ব্যবসাগুলোও কারখানার কর্মসংস্থান ও আয়প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প স্থবিরতা স্থানীয় অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করতে পারে।
উদ্যোক্তাদের তিন ধরনের চাপ
বর্তমানে শিল্পোদ্যোক্তারা একই সঙ্গে তিনটি বড় চাপ সামলাচ্ছেন। প্রথমত, উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয় কমছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন না হলেও শ্রমিকের বেতন, ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
কেউ কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালাচ্ছেন, কেউ বাইরে থেকে গ্যাস কিনছেন, আবার কেউ ডিজেলচালিত যন্ত্র ব্যবহার করছেন। এসব বিকল্পে উৎপাদন চালু রাখা গেলেও ব্যয় বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ না থাকায় বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
গ্যাস সংকট বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যয়ও
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়ছে। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়।
আবার বিদ্যুৎ না থাকলে শিল্পকারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি শিল্পকারখানার জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে। পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের কারখানাগুলোতেও বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা যখন পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন, তখন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া বাংলাদেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তৈরি পোশাকশিল্পের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গ্যাস সংকট বিশেষ করে ডাইং, ফিনিশিং, নিটিং ও টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত করছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় পড়ছে।
তাঁর মতে, একটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হলে শুধু সেই প্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; এর সঙ্গে যুক্ত অন্য কারখানা, শ্রমিক ও রপ্তানি কার্যক্রমও সমস্যায় পড়ে। সংকট দীর্ঘ হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ কঠিন হবে এবং ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত হলে অনেক কারখানার পক্ষে শ্রমিক ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে কমছে উৎপাদন
সাম্প্রতিক সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা হলেও গ্যাস খাতের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা আরও পুরোনো। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র ও কূপ থেকে পর্যাপ্ত উৎপাদন যুক্ত না হওয়ায় দেশীয় সরবরাহের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
ফলে কোনো এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, দুর্ঘটনা বা কার্গো সংকট দেখা দিলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিই আবার সামনে এনেছে।
প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সরবরাহ
শিল্পোদ্যোক্তাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা। ২৪ ঘণ্টা সমান চাপের গ্যাস দেওয়া সম্ভব না হলেও কখন, কতক্ষণ এবং কী পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে—এ বিষয়ে আগাম তথ্য থাকলে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারে।
অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে কারখানার মেশিন কখন চালু হবে, কখন বন্ধ হবে, কত শ্রমিককে কাজে রাখা হবে কিংবা কতটুকু উৎপাদন করা সম্ভব—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। শিল্পের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য সরবরাহ তাই তাৎক্ষণিক চাহিদার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে অনুসন্ধান বাড়ানোর তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালগুলো দ্রুত সচল করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে গতি বাড়াতে হবে।
পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের যেসব কূপ থেকে অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত কাজে লাগানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়টিও এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়ানো, যেখানে সম্ভব বিকল্প জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ, গ্যাসের অপচয় কমানো এবং অবৈধ সংযোগ বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানার চাকা কত দিন থেমে থাকবে?
বর্তমান গ্যাস সংকট কয়েকটি শিল্পাঞ্চলের সাময়িক দুর্ভোগের চেয়ে অনেক বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। উৎপাদন কমছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিকেরা কর্মহীন হচ্ছেন এবং উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব এক শিল্প থেকে আরেক শিল্পে ছড়িয়ে পড়বে। সুতা, কাপড়, ডাইং ও ফিনিশিং থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক পর্যন্ত পুরো উৎপাদনশৃঙ্খলেই চাপ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই গ্যাস সংকট এখন কেবল জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়। এটি শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না এলে আজ যে কারখানাগুলোতে মেশিন থেমে আছে, আগামী দিনে সেগুলোর সামনে আরও বড় প্রশ্ন দাঁড়াতে পারে—উৎপাদনের চাকা কবে আবার ঘুরবে?









