১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভিত নাড়িয়ে দেওয়া অন্যতম সফল ও দুঃসাহসিক গেরিলা অভিযানের নাম ‘অপারেশন জ্যাকপট’। জীবন বাজি রেখে বাঙালি নৌ-কমান্ডোদের পরিচালিত এই নিপুণ ও অতিগোপন অভিযানের মাধ্যমে মূলত পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র, রসদ ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এক বিশাল ও ধ্বংসাত্মক আঘাত হানা হয়েছিল।
কমান্ডোদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই হামলার ছক কষা হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রথম ব্যাচের নৌ-কমান্ডোদের চারটি ভিন্ন দলে ভাগ করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বুঝিয়ে দেওয়া হয়। দলগুলোর মধ্যে দুটি দলে ছিলেন ৬০ জন করে এবং অপর দুটি দলে ছিলেন ২০ জন করে অকুতোভয় সদস্য। এই চার দলের মূল টার্গেট ছিল দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট—চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর নদীবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর।
গোপন সংকেত হিসেবে বাংলা গান
পুরো অভিযানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক ছিল সংকেত বিনিময়ের মাধ্যম। প্রচলিত সামরিক যোগাযোগের বদলে এখানে ব্যবহার করা হয়েছিল দুটি বাংলা গান, যা কলকাতা আকাশবাণী থেকে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম সংকেত হিসেবে আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি’ গানটি নির্দিষ্ট করা হয়। এটি ছিল কমান্ডোদের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ। ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর বেজে ওঠে পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান’। এই দ্বিতীয় গানটি শোনামাত্রই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে মরণঘাতী হামলা শুরু করার চূড়ান্ত নির্দেশ পান যোদ্ধারা। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো নিছক বিনোদনমূলক গান মনে হলেও, ট্রানজিস্টর হাতে অপেক্ষায় থাকা দলনেতাদের কাছে এটি ছিল জীবন-মরণ লড়াইয়ের সংকেত।
অস্ত্রশস্ত্র ও হরিনা ক্যাম্প থেকে যাত্রা
কলকাতার পলাশীর হরিনা ক্যাম্প থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে যাত্রা করেন কমান্ডোরা। প্রত্যেক যোদ্ধার কাছে ছিল একটি করে শক্তিশালী লিমপেট মাইন, ধারালো ছুরি, একজোড়া সাঁতারের ফিন এবং কিছু শুকনো খাবার। ব্যাকআপ হিসেবে প্রতি তিনজনের জন্য বরাদ্দ ছিল একটি স্টেনগান। আর আকাশবাণীর গোপন সংকেত শোনার জন্য দলনেতাদের কাছে ছিল ছোট ট্রানজিস্টর।
মধ্যরাতের প্রলয়ংকরী আঘাত
পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫ আগস্ট দিবাগত রাত, অর্থাৎ ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরকে বেছে নেওয়া হয়। রাত সোয়া ১টার দিকে কমান্ডোরা নিঃশব্দে পানিতে নেমে জাহাজের দিকে সাঁতরে যান এবং লক্ষ্যবস্তুর গায়ে লিমপেট মাইন স্থাপন করে দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে আসেন। রাত ১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামে প্রথম ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর একে একে কেঁপে ওঠে চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জের বন্দরগুলো। ভোরের আলো ফোটার পরপরই সাড়ে ৬টার দিকে মোংলা বন্দরেও শুরু হয় মাইন বিস্ফোরণ। চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর এবং তাদের সহযোগিতাকারী বিদেশি একাধিক অস্ত্র ও রসদবাহী বিশাল জাহাজ।
অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ
এই অভাবনীয় হামলায় পাকিস্তানি বাহিনীর নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। শুধু সামরিক ক্ষতিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র এবং বাঙালির স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষার বার্তা পৌঁছে যায়। তবে এই অসামান্য বিজয়ের পেছনে ছিল অনেক বীর কমান্ডোর আত্মত্যাগ।
অপারেশন জ্যাকপট: একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিবরণ | তথ্য |
| অভিযানের নাম | অপারেশন জ্যাকপট |
| আক্রমণের সময়কাল | ১৫ আগস্ট দিবাগত রাত ও ১৬ আগস্ট (১৯৭১) |
| মূল লক্ষ্যবস্তু | চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দর |
| কমান্ডোদের বিভাজন | ৪টি দল (দুটিতে ৬০ জন করে, দুটিতে ২০ জন) |
| প্রথম সংকেত (প্রস্তুতি) | গান: ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি’ |
| দ্বিতীয় সংকেত (আক্রমণ) | গান: ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান’ |
| ব্যবহৃত মূল বিস্ফোরক | লিমপেট মাইন |
| অন্যান্য সরঞ্জাম | স্টেনগান, ছুরি, সাঁতারের ফিন, ট্রানজিস্টর ও শুকনো খাবার |
| শহীদ (ফুলছড়ি ঘাট) | কমান্ডো আব্দুর রাকিব |
| শহীদ (চট্টগ্রাম) | কমান্ডো হোসেইন ফরিদ |
| শহীদ (ফরিদপুর) | কমান্ডো খবিরউজ্জামান |
| নিখোঁজ কমান্ডো | সিরাজুল ইসলাম, এম আজিজ, আফতাব উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম |









